অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে অভিযান চালিয়ে বহু ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনের হেবরন শহরে হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর পুরো পশ্চিম তীর অবরোধের নির্দেশ দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। শনিবার (২৪ অক্টোবর) আল-জাজিরার সংবাদদাতারা জানান, পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের অন্তত ১৫টি শহর ও জনপদে অভিযান চালানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নাবলুস, জেনিন, তুবাস ও কালকিলিয়া। দক্ষিণ পশ্চিম তীরের হেবরনেও অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে একটি তিনতলা ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকশ ফিলিস্তিনি পরিবারকে বাড়িঘর ছেড়ে যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাবলুসের জালুদ ও কারইউত গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। সেখান থেকে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। জেনিনের কাছে আররাবেহ ও বুরকিন এলাকাতেও আটকের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া তুবাস ও পাশের আক্কাবা শহরে প্রবেশ করে ইসরায়েলি সেনারা। পশ্চিম তীরের পূর্বাঞ্চলে জেরিকো শহর ও আকাবাত জাবর শরণার্থীশিবিরেও অভিযান চালানো হয়। হেবরনে ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে তিনতলা একটি ভবন ভেঙে ফেলা হয়। ভবনটির বাসিন্দাদের নিজেদের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য মাত্র পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া হেবরনের আইন দেইর বাহা এলাকা ও আশপাশের কয়েকটি স্থানের কয়েকশ ফিলিস্তিনি পরিবারকে জোরপূর্বক বাড়ি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন এক ব্যক্তির বাড়িও ঘিরে ফেলে ইসরায়েলি বাহিনী। একই সঙ্গে শহরের আল-জালদা এলাকায় অভিযান চালানো হয়।
দুই সেনা নিহতের পর অবরোধের নির্দেশ
শুক্রবার হেবরনে হামলার পর পশ্চিম তীরজুড়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা আসে। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, টেলেম ইহুদি বসতির কাছে রিজার্ভ সেনাদের একটি ব্যাটালিয়নের ওপর হামলা চালান দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারী। এতে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হন। পরে ইসরায়েলি বাহিনী ওই দুই হামলাকারীকে হত্যা করেছে বলে জানায়।
ইসরায়েলের জরুরি চিকিৎসাসেবা সংস্থা জানিয়েছে, এ ঘটনায় আরও অন্তত তিন ইসরায়েলি সেনা আহত হয়েছেন। এরপর শুক্রবার পশ্চিম তীরে পূর্ণ অবরোধের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, হেবরনে তাদের অভিযান কয়েকদিন ধরে চলবে। পাশাপাশি পশ্চিম তীরের আরও কয়েক ডজন এলাকায় অভিযান চালানো হবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন অবৈধ বলে বিবেচিত।
বন্ধ হচ্ছে প্রায় ১০০০ চেকপোস্ট ও ফটক
অবরোধের কারণে পশ্চিম তীরের প্রায় এক হাজার চেকপোস্ট ও প্রবেশপথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে লাখ লাখ ফিলিস্তিনির দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চিকিৎসাসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও ব্যবসা-বাণিজ্যে এর প্রভাব পড়তে পারে। ফিলিস্তিনি ন্যাশনাল ইনিশিয়েটিভ রাজনৈতিক দলের মহাসচিব মুস্তাফা বারঘুতি বলেন, অবরোধের ফলে পশ্চিম তীরের প্রতিটি শহর ও গ্রাম যেন ‘একটি ছোট কারাগারে’ পরিণত হচ্ছে। তার অভিযোগ, চেকপোস্ট ও ফটক বন্ধ করে মানুষের চলাচল সীমিত করা হচ্ছে। এতে স্বাস্থ্যসেবা, অর্থনীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বারঘুতি সতর্ক করে বলেন, সম্মিলিত শাস্তির এ ধরনের পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরণমুখী করে তুলতে পারে।
বসতি স্থাপনকারীদের হামলা নিয়ে উত্তেজনা
পশ্চিম তীরে সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে উত্তেজনা বেড়েছে। বিশেষ করে জলপাই সংগ্রহের মৌসুমে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির দুই সেনা নিহত হওয়ার পর পশ্চিম তীরের ওপর ইসরায়েলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতা বারঘুতির অভিযোগ, ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি মন্ত্রীদের উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করছে। পশ্চিম তীরে অবরোধ, ধরপাকড় ও উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/




