বাংলার চোখ নিউজ :
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে বাড়ছে তাপমাত্রা। দীর্ঘ হচ্ছে তাপপ্রবাহের সময়কাল, বাড়ছে অতিরিক্ত গরমের ঘটনা। এর প্রভাব শুধু পরিবেশ বা দৈনন্দিন জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, পড়ছে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের ওপরও। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত গরমের সংস্পর্শে থাকলে গর্ভপাত, মৃত সন্তান প্রসব, জন্মগত ত্রুটি এবং নির্ধারিত সময়ের আগে সন্তান জন্ম দেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, গর্ভাবস্থায় বিপদের মুখে পড়তে অসহনীয় গরমের প্রয়োজন নেই। কোনো এলাকার স্বাভাবিক তাপমাত্রার তুলনায় সামান্য বৃদ্ধি ঘটলেও জটিলতার আশঙ্কা বাড়তে পারে। এ ঝুঁকি শুধু উষ্ণ বা মরুভূমি অঞ্চলের নারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নাতিশীতোষ্ণ ও শীতল জলবায়ুর দেশেও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী ১০০ কোটিরও বেশি নারী এ পরিস্থিতির শিকার হতে পারেন।
বাড়ছে তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো এলাকায় টানা পাঁচ দিন তাপমাত্রা ঐতিহাসিক সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ১০ শতাংশের মধ্যে থাকলে সেটিকে তাপপ্রবাহ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আর কোনো তাপপ্রবাহ সর্বোচ্চ বিস্তারের সময় পৃথিবীর অন্তত ১ শতাংশ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়লে তাকে বলা হয় ‘হিট স্টর্ম’।
১৯৬০-এর দশকে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের হিট স্টর্মের সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০টি। চলতি দশকে সেই সংখ্যা ৬৬৫ ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বিস্তৃত একটি হিট স্টর্ম প্রায় এক বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ এলাকা অতিক্রম করেছিল। মেক্সিকোতে লাখ লাখ শিশুর জন্মসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে রয়টার্স দেখেছে, গর্ভাবস্থার শেষ মাসে তাপপ্রবাহ বা হিট স্টর্মের সংস্পর্শে এলে অপরিণত সন্তান জন্মের হার সর্বোচ্চ ১৮ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তাপমাত্রা বাড়লে বাড়ে গর্ভাবস্থার জটিলতা
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করার সময় মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয় গবেষক দর্শনিকা লাখুর। পরে তিনি ইউনিভার্সিটি অব দ্য উইটওয়াটার্সর্যান্ডের একটি গবেষক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। দলটি গর্ভবতী নারীদের ওপর অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাব নিয়ে কাজ করে।
লাখু ও তার সহকর্মীরা এ বিষয়ে প্রায় ২০০টি বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত গবেষণা প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, গর্ভাবস্থায় বিপজ্জনক তাপমাত্রার নির্দিষ্ট সীমা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও, একজন নারী যে তাপমাত্রার পরিবেশে অভ্যস্ত, তার তুলনায় তাপমাত্রা কতটা বাড়ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণায় উঠে এসেছে, কোনো এলাকায় গর্ভবতী নারীর বসবাসের স্থানের গড় তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে মৃত সন্তান প্রসবের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। অতিরিক্ত গরমের সঙ্গে জন্মগত ত্রুটি, গর্ভপাত এবং প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল জরায়ুর দেয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিরও সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
মায়ের স্বাস্থ্যেও পড়ছে প্রভাব
অতিরিক্ত তাপমাত্রা গর্ভবতী নারীর উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া গর্ভাবস্থার একটি গুরুতর জটিলতা। এর কারণে কিডনি বিকল হওয়া, হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
চীনের ২০ লাখ নারীর ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অস্বাভাবিক গরমের কারণে প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকি ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বেশি ঝুঁকিতে কারা?
গবেষকদের মতে, সব অন্তঃসত্ত্বা নারীই অতিরিক্ত গরমের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তবে আগে থেকে শারীরিক অসুস্থতা, আর্থিক সংকট কিংবা সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা নারীদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। দরিদ্র নারী, বেশি বয়সে গর্ভধারণ করা নারী, ধূমপায়ী, নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারী এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত নারীদের ক্ষেত্রে তাপপ্রবাহের প্রভাব আরও গুরুতর হতে পারে। গবেষক অধ্যাপক ম্যাথিউ চেরসিচ বিশেষভাবে যমজ সন্তান ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ‘যমজ সন্তান ধারণের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থা তাপমাত্রার প্রভাবের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।’
মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপপ্রবাহের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্ব বাড়তে থাকলে অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকিও আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাই মাতৃস্বাস্থ্য সেবায় তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় অতিরিক্ত গরমের প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং ঝুঁকিতে থাকা নারীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই বাস্তবতায় মা ও শিশুর সুরক্ষায় স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রস্তুতিও জোরদার করা প্রয়োজন।




