ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে আটক ও ক্ষমতা থেকে নাটকীয়ভাবে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাপ্রবাহের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরায়েলি রাজনীতিবিদরাও প্রকাশ্যে ইরানকে সতর্ক করে বলেছেন, ভেনেজুয়েলার পরিণতি থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা এ তথ্য জানিয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বৈঠকের এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ভেনেজুয়েলায় এই অভিযান পরিচালিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোর অপসারণ কেবল ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের পূর্বাভাস।
মাদুরোকে আটকের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ইয়াইর লাপিদ তেহরানকে উদ্দেশ করে বলেন, ভেনেজুয়েলায় যা ঘটছে, ইরানের শাসকদের তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। এর আগে গত সপ্তাহে ফ্লোরিডায় নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যদি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনর্গঠন করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও হামলা চালাবে।
ন্যাশনাল ইরানিয়ান আমেরিকান কাউন্সিলের (এনআইএসি) প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, এই নতুন পরিস্থিতি পুরো অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে এবং যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তার মতে, মাদুরোর অপহরণ ইরানকে এমন প্রতিক্রিয়ায় প্ররোচিত করতে পারে, যা সরাসরি সামরিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির সিনিয়র ফেলো নেগার মোর্তাজাভি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ম্যাক্সিমালিস্ট’ অবস্থান কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাকে ক্ষীণ করে দিচ্ছে। তিনি বলেন, তেহরানে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার নামে কেবল আত্মসমর্পণ চাইছে। ফলে ইসরায়েল, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এখন সম্ভাব্য সংঘাতের পথে দাঁড়িয়ে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও দাবি করেছেন, মাদুরোর সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং হিজবুল্লাহকে লাতিন আমেরিকায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগই এই অভিযানের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, ট্রাম্প যা বলেন, তা বাস্তবায়ন করেই ছাড়েন।
মাদুরো আটক হওয়ার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি কঠোর ভাষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমরা শত্রুর কাছে নতি স্বীকার করবো না; বরং শত্রুকে নতজানু করবো।’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ওপর অবৈধ আগ্রাসন হিসেবে অভিহিত করে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে।
রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান মার্জরি টেইলর গ্রিন ইঙ্গিত দেন, ভেনেজুয়েলার তেলের নিয়ন্ত্রণ পেলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সামাল দেওয়া সহজ হবে। তার মতে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়, যা ইরান বন্ধ করে দিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি ‘কুশন’ হিসেবে কাজ করবে।
তবে বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভির মতে, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের এই অভিযান মোটেও সহজ হবে না। যদিও ট্রাম্প ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ পছন্দ করেন না, তবু ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনাও তিনি পুরোপুরি নাকচ করেননি।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ এই অপহরণের পেছনে ‘জায়নবাদী শক্তির’ হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। এর জবাবে ট্রাম্প তাকে সতর্ক করে বলেন, মার্কিন দাবি না মানলে তাকে মাদুরোর চেয়েও ‘বড় মূল্য’ দিতে হতে পারে।





