সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

৮০ কিলোমিটারের মেরিন ড্রাইভে পর্যটকের ভিড়, নিরাপত্তা কতটা?

দৈনিক বাংলার চোখ :

কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের দুই পাশে গড়ে উঠছে পর্যটন অবকাঠামো। নিরিবিলি পরিবেশের টানে শহর থেকে দূরের সৈকত ও সেখানকার রিসোর্টে ছুটছেন পর্যটকেরা। তবে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা গড়ে উঠছে না একই গতিতে। বিশেষ করে সৈকতের অপ্রচলিত ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম ও কার্যকর সতর্কতাব্যবস্থার অভাব রয়েছে।

গত বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে পেচারদ্বীপ সমুদ্রসৈকতে ঢেউয়ের তোড়ে পাঁচ পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে নিরাপত্তার এই ঘাটতি। এর আগে গত বছরের ৮ জুলাই একই সৈকতে ঢেউয়ের তোড়ে প্রাণ হারান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী সাবাব ও আসিফ। নিখোঁজ রয়েছেন অরিত্র হাসান।

পর্যটকদের অভিযোগ, দুর্ঘটনা ঘটলেও প্রত্যন্ত সৈকতগুলোতে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। এ অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ, উদ্ধার ইউনিট স্থাপন এবং পর্যটকদের সচেতন করার উদ্যোগ নেয়ার দাবি উঠেছে। মেরিন ড্রাইভে স্থল ও ডুবুরি ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। তবে সেই পরিকল্পনা কবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মেরিন ড্রাইভের পেচারদ্বীপ সমুদ্রসৈকতে গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ঢেউয়ের তোড়ে পাঁচ পর্যটকের মৃত্যু হয়। তাদের সবাই সৈকতসংলগ্ন একটি রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন। নিরিবিলি পরিবেশের আকর্ষণে সেখানে গেলেও সমুদ্রে নামার ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা এবং বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধারের ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

পর্যটক সাইফ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা অবশ্যই এ ধরনের ঘটনায় চিন্তিত। কারণ, আমরা ভ্রমণে আসি মানসিক প্রশান্তি ও কিছুটা স্বস্তির জন্য। সেখানে যদি জীবনের ঝুঁকি থাকে কিংবা প্রাণ হারানোর আশঙ্কা থাকে, তাহলে মানুষ পরবর্তী সময়ে কক্সবাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হবে।’সমুদ্রে নামার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি, দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপদ থাকার উপায় সম্পর্কে পর্যটকদের স্পষ্ট ধারণা দেয়া জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

সাইফ উদ্দিন বলেন, একজনকে উদ্ধার করতে গিয়ে আরও পাঁচজনের প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের দুর্ভোগ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। ঘটনার দিন তিনি একই রিসোর্টে অবস্থান করছিলেন এবং দুপুরে নিহত পর্যটকদের সঙ্গে একসঙ্গে খাবারও খেয়েছিলেন। তিনি বলেন, সাত বন্ধুর মধ্যে চারজন ফিরে এসেছেন, আর বাকি তিনজনের মরদেহ এসেছে। পরে বাকি চারজন কান্নাকাটি করতে করতে রিসোর্ট ছেড়ে চলে যান। ঘটনাটি সত্যিই হৃদয়বিদারক। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সমুদ্রে নামার আগে প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও নির্দেশনা দেয়া অত্যন্ত জরুরি।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিসোর্ট মালিক, হোটেল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন পর্যটক সোহানুর রহমান। তিনি বলেন, প্রত্যেকটি রিসোর্টের মালিক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সরকারের বৈঠক করা উচিত। পর্যটন খাতের সঙ্গে জড়িত সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে পর্যটকেরা সমুদ্রে নামার বিধিনিষেধ, করণীয় ও বর্জনীয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পান।

সোহানুর রহমান বলেন, পর্যটকেরা স্থানীয় নন। ফলে সমুদ্রের পরিস্থিতি, কোন সময়ে সমুদ্রে নামা নিরাপদ এবং কখন নামা উচিত নয়-এসব বিষয়ে অনেকের পর্যাপ্ত ধারণা থাকে না। তাই পর্যটকেরা রিসোর্টে পৌঁছানোর পর তাদের এসব বিষয়ে জানানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোকেও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ সৈকতে সার্বক্ষণিক না হলেও অন্তত একজন স্ট্যান্ডবাই লাইফগার্ড রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, শুধু সতর্কবার্তা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত উদ্ধারকাজ চালানোর মতো প্রস্তুতিও থাকতে হবে।

হোটেল কক্স টুডের মহাব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ বলেন, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে সমুদ্রসৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আধুনিক সরঞ্জাম ও উন্নত লাইফগার্ড ব্যবস্থাপনা রয়েছে। চাইলে কক্সবাজারেও এসব কার্যকর ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তিনি বলেন, এ জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা ও উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকলে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ও আধুনিক উদ্ধার ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

 

শেয়ার করুন