শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঠান্ডা মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াকে প্রথম গুলিটি করেন মোজাফফর!

ঠান্ডা মাথায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে লক্ষ্য করে প্রথম গুলিটি করেছিলেন মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন—মামলার নথিতে এমনটাই উল্লেখ রয়েছে। প্রায় সাড়ে চার দশক ছদ্মবেশে পলাতক থাকার পর রাজধানীর বনানী ডিওএইচএস থেকে তাকে গ্রেফতার করেছে ডিবি।

গোয়েন্দাদের দাবি, মেয়ের কর্মস্থল ও নাকের নিচের একটি তিলকে সূত্র ধরে পরিচালিত অভিযানে ধরা পড়েন জিয়া হত্যা মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মেজর (অব.) মো. মোজাফফর হোসেন ১৯৮১ সালের ৩১ মে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল পরিকল্পনাকারী। তিনি ছিলেন কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য। ১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে একদল বিপথগামী সেনা কর্মকর্তা চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে হামলা চালিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যা করে। হত্যাকাণ্ডের সামরিক তদন্তের পর দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যে ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছিল, মোজাফফর হোসেন ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম। ঘটনার পর থেকেই তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে ফেরারি ছিলেন।

মামলার নথি, তদন্তের বিবরণী থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের সেই কালরাতে মেজর মোজাফফরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর। আক্রমণের সময় সার্কিট হাউজে হানা দিয়ে মেজর মোজাফফর ও ক্যাপ্টেন মোসলেহ উদ্দিন সরাসরি রাষ্ট্রপতির কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। মোজাফফরই প্রথম ব্যক্তি ছিলেন যিনি সশরীরে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে কক্ষের বাইরে এনে শনাক্ত করেন। শুধু শনাক্ত করাই নয়, ঠান্ডা মাথায় তিনি রাষ্ট্রপতিকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলি চালান বলে মামলার বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পরপরই মোজাফফর চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুরকে ফোনে ইংরেজিতে একটি ঐতিহাসিক বার্তা দেন, ‘দ্য প্রেসিডেন্ট হ্যাজ বিন কিল্ড’। ১৯৮১ সালের ৩১ মে যখন সরকারি বাহিনী পুনরায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়, তখন বিদ্রোহের মূল হোতা মেজর জেনারেল মঞ্জুরসহ অনেকেই গ্রেফতার হন এবং পরে মঞ্জুর নিহত হন। তবে মেজর মোজাফফর হোসেন এবং মেজর এসএম খালেদ কৌশলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

এতদিন পর কীভাবে ধরা পড়ল ইতিহাসের এই খলনায়ক, জানতে চাইলে অভিযানে থাকা ডিবির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ এড়াতে অপরাধীরা কত ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ এই মোজাফফর। নিজের অবয়ব, চালচলন, এমনকি পেশা ও বাসস্থান পরিবর্তন করে সে দীর্ঘদিন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিচয়ে ছদ্মবেশে অবস্থান করছিল। এ কারণে পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে তার অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ক্লু ছিল না। তবে অপরাধ যতই নিখুঁত হোক না কেন, অপরাধীর কোনো না কোনো চিহ্ন বা সূত্র থেকেই যায়। এটাই নির্মম নিয়তি। আর সেই সূত্র ধরেই এত বছর পর তাকে ডিবি গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে।গ্রেফতারের সূত্র জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, ডিবির বিশ্বস্ত টিম জানতে পারে, গোয়েন্দা কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে তার মেয়ের কর্মস্থলের সূত্র ধরে অনুসন্ধান শুরু করেন। জানা যায়, তার মেয়ে একটি বেসরকারি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে (এয়ারটেল) চাকরি করেন। কয়েক মাস ধরে মেয়ের কর্মস্থল এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে গোয়েন্দারা একটি সম্ভাব্য বাড়ির ঠিকানা চিহ্নিত করেন। বাড়িটি চিহ্নিত করার পর ডিবি কর্মকর্তারা বেশ কিছুদিন ধরে দূর থেকে লক্ষ্য রাখেন এবং ছদ্মবেশে সার্বিক পরিবেশ ও মোজাফফরের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন। গোয়েন্দাদের কাছে মোজাফফরের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের একটি ক্লু আগে থেকেই নথিবদ্ধ ছিল। তার নাকের ঠিক নিচে একটি আঁচিল বা তিল সদৃশ কালো দাগ রয়েছে। চেহারা পরিবর্তন করলেও এই জন্ম চিহ্নটি পরিবর্তনের সুযোগ তার ছিল না। অভিযানে যাওয়ার আগে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এই চিহ্নটিকে তাদের প্রধান শনাক্তকরণ সূত্র হিসাবে নির্ধারণ করেন।

বুধবার গভীর রাতে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। করা হয় অভিযানের চূড়ান্ত পরিকল্পনা। গোয়েন্দা দল ছদ্মবেশে বাসার দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতর থেকে দরজা খোলার পর অত্যন্ত নাটকীয় ও সুকৌশলে এগোয় পুরো প্রক্রিয়া। দরজা খেলার পর গোয়েন্দারা সরাসরি কোনো অভিযান বা গ্রেফতারবিষয়ক কোনো ভয়ভীতি না দেখিয়ে অতিথির মতো স্বাভাবিক আচরণ করেন। মেয়ের নাম ধরে জানতে চান অমুক (তার মেয়ে, যিনি এয়ারটেলে কাজ করেন) বাসায় আছেন কিনা। এ সময় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিজেদের ‘এয়ারটেল অফিস’ থেকে আসা কর্মী হিসাবে পরিচয় দেন।

তবে এত রাতে অফিসের লোক বাসায় আসায় স্বাভাবিকভাবেই ঘরের ভেতর থেকে কৌতূহল ও কিছুটা সন্দেহ তৈরি হয়। এজন্য বাসার ভেতর থেকে একজন বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তি দরজা খুলে এগিয়ে এসে জানতে চান, ‘এত রাতে অফিসের কাজ কেন? আমাকে বলুন কী বিষয়। গোয়েন্দারা তখন কৌশলগতভাবে বয়োজ্যেষ্ঠ লোকটির চেহারা পর্যবেক্ষণ করেন। বাড়ির অল্প আলোতেও কর্মকর্তাদের চোখ এড়ায়নি তার নাকের নিচে থাকা সেই পরিচিত তিল বা আঁচিলটি। এ সময় কর্মকর্তারা বলেন, ‘মুরব্বি, আমরা তো আপনাকে চিনি না, আপনি কে? আমরা যার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি, তার সঙ্গে দেখা করতে দিন।’ সরল বিশ্বাসে এবং কিছুটা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সেই ব্যক্তি উত্তর দেন ‘আমি মোজাফফর। মেয়ের বাবা’। মুখ থেকে একথা শোনার পর আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি ডিবির চৌকশ দল। পলকের মধ্যে পকেট থেকে বের হয়ে আসে হ্যান্ডকাফ। অতঃপর মোজাফফরের দুই হাত বন্দি হয়ে যায় ডিবির শিকলে। চোখের পলকে দীর্ঘদিনের ছদ্মবেশী ও সুচতুর পলাতক আসামির হাতজোড়া অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে আইনের খাঁচায়। এরপর হতভম্ব চাহনি আর অপ্রস্তুত আত্মসমর্পণ বুঝিয়ে দেয়, ডিবির এই নিখুঁত অপারেশন কতটা নিঁখুত ও পরিপক্ব ছিল।

গোয়েন্দা সূত্রে মোজাফফরের সাড়ে চার দশকের পলাতক জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা গেছে। গ্রেফতার এড়াতে মোজাফফর দীর্ঘদিন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ছদ্মনামে আত্মগোপন করেছিলেন। নিজেকে আড়াল করতে তিনি নিজের আসল পরিচয় সম্পূর্ণ মুছে ফেলেন। বছরের পর বছর ধরে তিনি ভুয়া নাম, পরিচয় এবং জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে চলতেন। এতদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি। সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ডিবি পুলিশ বনানী ডিওএইচএস এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করে।

ডিএমপি ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘তিনি একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ছিলেন। তাই প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে সেনাবাহিনীর নিজস্ব জুডিশিয়াল প্রসেস বা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’১৯৮১ সালের ৩১ মে যখন সামরিক অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং সেনাবাহিনীর তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর নিহত হন, তখন মোজাফফর বুঝতে পারেন তার বাঁচার কোনো পথ নেই। তাই তিনি তার আরেক সহযোগী মেজর এসএম খালেদ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে কৌশলে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রবেশ করেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে তিনি দীর্ঘ সময় কাটান। ১৯৯৭-১৯৯৮ সালের দিকে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থান করেন এবং সেখান থেকেই পরবর্তী জীবনের ছক আঁকেন।মোজাফফর হোসেন তার নিজস্ব আসল পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলেছিলেন। তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি ছদ্মনাম ধারণ করেন এবং নিজের চেহারা ও বেশভূষায় পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘ ৪৫ বছরে তার পারিবারিক যোগাযোগ এবং পুরোনো চেনা পরিমণ্ডলের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন, যাতে কোনোভাবেই কল ট্র্যাকিং বা নজরদারির মাধ্যমে তার সন্ধান না মেলে। জীবনের শেষভাগে এসে তিনি অত্যন্ত গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বসবাস শুরু করেন রাজধানীর সবচেয়ে সুরক্ষিত ও অভিজাত এলাকাগুলোর একটি বনানী ডিওএইচএসে। একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হিসাবে ডিওএইচএস এলাকাটি তার চেনা পরিবেশ হলেও, সেখানে তিনি নিজেকে একজন সাধারণ, বয়োবৃদ্ধ এবং রাজনীতিবিমুখ নাগরিক হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিলেন। আশপাশের মানুষ বা প্রতিবেশীরা কেউই কল্পনাও করতে পারেনি যে, তাদের পাশে বসবাসকারী এই বৃদ্ধই আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর রাষ্ট্রপতি হত্যাকাণ্ডে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত প্রধান ঘাতক।

পলাতক অবস্থায় তিনি কেবল ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ভারতের ভুয়া নাগরিকত্ব বা জাল নথির সাহায্যে তিনি পাসপোর্ট তৈরি করেছিলেন। এই ভুয়া আন্তর্জাতিক নথির ওপর ভর করে তিনি বিশ্বের একাধিক দেশ সফর করেছেন এবং বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) বা বাংলাদেশের গোয়েন্দারা তার আসল নামে খোঁজ করেও দীর্ঘদিন কোনো হদিস পাননি।

শেয়ার করুন