শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

হামে মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা

হামের মতো রুবেলা, চিকেন পক্স, ডেঙ্গুতেও গায়ে র‌্যাশ ও জ্বর হয়। ফলে কারও হাম উপসর্গ দেখা দিলে প্রথমে রোগ শনাক্ত জরুরি। মারা গেলে ডেথ রিভিউ তথা মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে জানানো হলে জনসচেতনতা বাড়বে। কিন্তু দেশব্যাপী প্রাদুর্ভাব ছাড়ানো হামে ডেথ রিভিউয়ের তথ্য দিচ্ছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। এতে ভাইরাসটিতে মৃত্যুর তথ্য নিয়ে জনমনে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম (মিজেলস) চিকেন পক্স ও মামস অত্যন্ত সংক্রামক রোগ। রোগীর কাছাকাছি থাকলেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক হাসপাতালে রোগীর চাপ থাকায় আইসোলেশন বা দূরুত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করলেও সব সময় সম্ভব হচ্ছে না। হাসপাতালে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। হামের চিকিৎসায় কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ না থাকায় উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ শিশুর হামজনিত মারাত্মক নিউমোনিয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাম উপসর্গ ও হাম সন্দেভাজন আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য দিচ্ছে। বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্র ও চেম্বারে যাওয়া রোগীদের তথ্য থাকছে না অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যে। ফলে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সঠিক চিত্র জানা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে হাম উপসর্গে মারা যাওয়া শিশুদের ডেথ রিভিউ করে তথ্য জানানো হলে রোগী ব্যবস্থাপনা ও প্রতিরোধে করণীয় সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ হবে।

এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে ও উপসর্গ নিয়ে ছয় শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে নতুন করে ২৫৯ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে হামে দুজন এবং বাকিরা চারজন লক্ষণ নিয়ে মারা গেছে। এ নিয়ে সারা দেশে ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ৫৪ জনের। এ ছাড়া সন্দেহজনক হাম রোগের লক্ষণ নিয়ে ২৬৩ জন মারা গেছে। এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ১২৭ জন ঢাকায় মারা গেছেন; আর ৭১ জন রাজশাহী বিভাগে।

গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ১৮৬ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে আসে যাদের মধ্যে ৯৮৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ৪১৭ জন ভর্তি হয়েছে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে। আর সবচেয়ে কম ৫ জন ভর্তি হয় রংপুরে। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা ৪২ হাজার ৯৭৯ জন। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৭২৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতাল ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের চিকিৎসকরা যুগান্তরকে বলছেন, অনেক শিশু রোগ নিরাময়ের জন্য হাসপাতালে গিয়ে হাম সংক্রামিত হচ্ছে। যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘ক্রস-ইনফেকশন’ বলা হয়। হাসপাতালের ভেতরের ক্রস-ইনফেকশনের পাশাপাশি পরিবারের ভেতরেও দ্রুত ছড়াচ্ছে শৃঙ্খল সংক্রমণ বা চেইন ইনফেকশন। তাছাড়া হামের চিকিৎসায় কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। হামের কারণে নিউমোনিয়া হলে জটিল হয়। হাসপাতালে শিশুদের আনা হচ্ছে অনেক জটিল হওয়ার পর। লাইফ সাপোর্ট দিয়েও তাদের বাঁচানো যাচ্ছে না।

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, সরকার হামে মৃত্যু সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ করছে না। যেমন; হাম উপসর্গে মৃত শিশুদের বয়স বিভাজন করা। হাম হওয়ার কত দিন পর হাসপাতালে এসেছে। কোন শিশু কোন ধরনের জটিলতা নিয়ে ভর্তি ছিল। মৃত শিশুদের সবার নিউমোনিয়া ছিল কিনা। নিউমোনিয়ার সঙ্গে আর কী কী রোগ ছিল। হাসপাতালে আসতে কত শিশুর বিলম্ব হয়েছে। হাসপাতালে ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি ছিল কিনা। কোন কোন ওষুধ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রশ্নের উত্তর শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে ভূমিকা রাখত পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজীর আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, হামে মারা যাওয়া শিশুর ডেথ রিভিউ যেমন; শিশু টিকা পেয়েছিল কিনা, কত ডোজ পেয়েছে, কখন পেয়েছে। কোন আর্থসামাজিক পরিবেশের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে, কোন এলাকায় সংক্রমণ-মৃত্যু বেশি এ ধরনের অনেক তথ্য জানা যেত। ভাইরাসটি প্রতিরোধে করণীয় বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হতো। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি জটিল না হয় সে ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া যেত। তিনি বলেন, ডেথ রিভিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ আসা উচিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতালভিত্তিক টিম গঠন করা উচিত। এভাবে জেলা ও বিভাগে ডেথ রিভিউয়ের কাজ করতে পারলে ভালো হতো। ভাইরাসটির পাশাপাশি ‘ম্যাটারনাল নিউনেটাল চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডোলেসেন্ট হেলথ’ নিয়ে গবেষণার পরিধি বাড়বে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান যুগান্তরের কাছে দাবি করেন, হামের ডেথ রিভিউয়ের ফরমাল কোনো উদ্যোগ নেই। তবে মাঠপর্যায়ে দৈনন্দিন আক্রান্ত-মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল রিভিউ হচ্ছে। এর বাইরে ডেথ রিভিউয়ের বিশেষ কিছু ক্ষেত্র যেমন; ভাইরাসটির (মিজেলস) জিনগত পরিবর্তন ও সাব টাইপ (উপধরন) হচ্ছে কিনা? এটা মিজেলস না অন্য কিছু, অন্য কোনো কারণ হচ্ছে কিনা এমন সাব-স্পেশালিটি নিয়ে রিভিউ করা হয়। চলমান প্রার্দুভাবে এরকম কিছু মনে না হওয়ায় এই মুহূর্তে ব্যয়বহুল সাবস্পেশালিটি রিভিউয়ের কোনো চিন্তাভাবনা অধিদপ্তরের নেই।

তিনি আরও বলেন, ট্র্যাডিশনাল রিভিউ সাধারণত রোগতত্ত্ববিদরা করে থাকেন। যেমন; কি ধরনে আক্রান্ত হচ্ছে, উপসর্গগুলো কি, গড় বয়স কত, টিকা দিয়েছে কিনা, জ্বর কতদিন থাকছে ইত্যাদি। এছাড়া কোন এলাকা বা উপজেলায় প্রকোপ বেশি, কতসংখ্যক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কারা আক্রান্ত হচ্ছে, কত মারা গেছে, কত সুস্থ হয়েছে দেখা হয়। এটা অনলাইনে দেওয়া হচ্ছে। ডেথ রিভিউ আলাদা করে না দিয়ে শুধু নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

শেয়ার করুন