বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কঠিন রিজিড পেভমেন্ট দ্বারা রাস্তা নির্মানের উপদেশ: প্রকৌশলী গোলাম কিবরিয়া

( স্টাফ রিপোর্টার ):

বাংলাদেশে রাস্তা নির্মাণে মাঠ পর্যায়ে রিজিড পেভমেন্ট অর্থ্যাৎ (RCC)দ্বারা রাস্তা  উন্নয়ন কাজে যে সমস্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা  বিভিন্ন পর্যায়ে পর্যবেক্ষণ ও অর্জন করেছি,বিষয়টি প্রকৌশলী সমাজের কাছে তুলে ধরার প্রয়োজন অনুভূত হচ্ছে। সেই কারণে পর্যবেক্ষণলব্ধ বাস্তব অভিজ্ঞতা সমূহ যাহাতে অন্য প্রকৌশলীদের যদি কোন কাজে আসে সেই প্রেক্ষিতেই কিছু অর্জিত অভিজ্ঞতা নিম্নে তুলে ধরা হলো। ইহাতে সামান্য কিছু উপকার হলে সেটাই আমার প্রাপ্য।

পর্যবেক্ষণসমূহ:
১) RCC রোড ডিজাইন সম্পর্কে নিজের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করাতে হীনমন্যতা নেই । তবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে কিছু অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ হলো, যা অন্য কারো উপকারে লাগতে পারে—এই ভাবনা থেকেই বিষয়সমূহ এখানে তুলে ধরা হলো।

২) LGED–এর একজন গ্র্যাজুয়েট ইঞ্জিনিয়ার, যিনি সহকারি প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তাকে একটি ক্ষতিগ্রস্ত RCC রোডের মেরামতের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রাস্তার বেশ কিছু অংশের কংক্রিট সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। শুধু MS রডের কঙ্কালটুকু অবশিষ্ট ছিল। এই MS রডগুলোও ছিল আলাদা–আলাদা, বিচ্ছিন্ন এবং ধারাবাহিকতা ছিল না। ফলে সেখানে ল্যাপিং প্রয়োজন ছিল।

৩) ঐ ইঞ্জিনিয়ার ল্যাপিং করে MS রডের ধারাবাহিকতা তৈরি করেন এবং কাস্টিং সম্পন্ন করেন। এরপর রাস্তা যানবাহন চলাচলের উপযোগী হয়।

৪) কিন্তু যানবাহনের চলাচলে তৈরি হওয়া ভাইব্রেশন, লোডের ঢেউ এবং ওয়েভের কারণে ল্যাপিং স্থানে পৃথকীকরণ ঘটে এবং কংক্রিট আবার ভাঙতে শুরু করে।

৫) ইঞ্জিনিয়ার MS রডগুলো ওয়েল্ড করেননি। ফলে সৃষ্ট স্ট্রেস রডের মাধ্যমে সঠিকভাবে ট্রান্সফার হতে পারেনি, যা স্থানীয়ভাবে জমা হয়ে ক্রমাগত ভাইব্রেশন সৃষ্টি করে নতুন RCC ঢালাইটুকুও পূর্বের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইহার ফলে কাজের—গুণগত মান নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

৬) কাজটি স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী করা হলেও একটি ছোট প্রযুক্তিগত ভুল—MS রড না ওয়েল্ড করা—পুরো কাজ, ইঞ্জিনিয়ারের সুনাম এবং বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

৭) একই ঘটনা যদি ভবনে ঘটত, সমস্যা ততটা হত না। কারণ ভবন একটি স্থির কাঠামো—সেখানে যানবাহন চলাচলের কারণে  ক্রমাগত কোন কম্পনের সৃষ্ট নেই। যেন চুপচাপ বসে থাকা নিরীহ ছেলের মতো—যে নিজ থেকে কোনো ঝামেলা সৃষ্টি করে না।

৮) হাটিকুমরুল ফ্লাইওভারের একটি ছোট RCC রোড সেগমেন্ট বহুবার মেরামত করেও টেকসই সমাধান পাওয়া যায়নি। আমার পর্যবেক্ষণ হলো—

a) ঐ সেগমেন্টটি যদি পাশের স্ল্যাবের সাথে (মনোলিথিক)ভাবে কাস্ট করা হতো, তাহলে অনেকদিন টেকসই হতো, অথবা
b) সবদিকে ডাওয়েল বার প্রদান করা হলে চাকা–লোড থেকে সৃষ্টি হওয়া ভাইব্রেশন / শক পাশের স্ল্যাবে ট্রান্সফার হতে পারত,
c) স্ল্যাবের অবস্থান এমন স্থানে যে  সেখানে ট্রাফিক ব্রেক–করা, স্পিড–কন্ট্রোলে কমানো–বাড়ানো ইত্যাদি কারণে টর্শন, অ্যাব্রেশন, শক–ওয়েভ, ইম্প্যাক্ট সবই একত্রে কাজ করছে। এখানে বিশেষ ডিজাইন প্রয়োজন ছিলো—ঠিক যেমন মেট্রো রেলের কার্ভ অংশে বিশেষ ডিজাইন ছিলো।

৯) উচ্চ ট্রাফিক ভলিউম ও ভারী লোডের ক্ষেত্রে ডাওয়েল বারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি আগের লেখায় উল্লেখ করেছি—ডাওয়েল বার কিভাবে কাজ করে। স্ল্যাবের মধ্যবর্তী ফাঁক অবশ্যই বিটুমিনাস মিশ্রণ দিয়ে ভরাট করতে হবে—এটি ট্রাফিক চলাচলে সৃষ্ট এন্ড–স্ট্রেস কমায়। LGED–এর প্রকৌশলীরা এই  দিকটিতে কম মনোযোগ দেয় বলে মনে হয়।

১০) যেখানে কম ট্রাফিক—শুধু রিকশা বা ভ্যান চলে—সেখানে এসব সমস্যা হয় না। কিন্তু ভারী ট্রাফিক থাকা সড়কে ডাওয়েল বার ও সঠিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য, এবং স্ল্যাব–জয়েন্ট ভরাট করাও অত্যাবশ্যক। ইঞ্জিনিয়ারদের এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

১১) LGED–এ সাধারণত স্ল্যাবের মাঝখানে টিপিক্যাল ডিজাইন অনুযায়ী গাইডওয়াল নির্মাণ করা হয়। কিন্তু এই ডিজাইন সাধারণ পরিস্থিতি ধরে করা—যা ফিল্ড–কন্ডিশনের সাথে সবসময় সঙ্গতিপূর্ণ নয়। উপজেলা পর্যায়ের ইঞ্জিনিয়ারদের মাঠের পরিস্থিতি অনুযায়ী সমন্বয় করতে হবে। যেখানে শোল্ডার স্থিতিশীল, পাশে বাড়িঘর,সেখানে দুই ফুট নয়, এক ফুট গাইডওয়ালই যথেষ্ট। কিন্তু যেখানে ঢাল বা শোল্ডার দুর্বল—সেখানে গভীর ভিত্তির গাইডওয়াল প্রয়োজন হতে পারে। এখানে কঠোর নিয়ম নেই—আবশ্যকতাই আসল বিষয়। মাঠপর্যায়ের ইঞ্জিনিয়ারদের এটি ভালোভাবে বুঝতে হবে। অন্ধভাবে টিপিক্যাল ডিজাইন অনুসরণ করলে সমস্যা হবেই।

১২) সাইট পরিদর্শনে গেলে আমি UE ও SAE–দের সর্বদা মনে করিয়ে দিতাম—ফিল্ড কন্ডিশন অনুযায়ী কাজ করতে হবে, টিপিক্যাল ডিজাইন হুবহু অনুসরণ নয়। বিচারবুদ্ধি ও সাধারণ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে প্রাক্কলন (estimate) প্রস্তুত করতে হবে। সরকারের একটি টাকাও অপচয় নয়—প্রয়োজন–ভিত্তিক, সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে estimate প্রস্তুত করতে হবে।

১৩) উত্তরাঞ্চল ও চর এলাকায় মাটি বেলে প্রকৃতির। এখানে চার দিনের soaked CBR বহু ক্ষেত্রে ১০% এর উপরে থাকে, ফলে ISG–এর কোনো প্রয়োজন নেই। তাই RCC বা যেকোনো রাস্তা উন্নয়নের estimate–এ ISG আইটেমটি বাদ দেওয়া উচিত। এ বিষয়ে UE ও SAE–দের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শেয়ার করুন