গত জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)–র সমাবেশকে কেন্দ্র করে যে সংঘাত ঘটে, সেসহ ঘটনার নেপথ্যে স্থানীয়ভাবে এনসিপি ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের উভয়েরই দায় রয়েছে—এমনই নথিভুক্ত হয়েছে একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনটি বলছে, উসকানি ও গুজব, দুপক্ষের কট্টর অবস্থান এবং মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের অনাসঙ্গতি মিলিয়ে যখন প্রশাসন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই সিদ্ধান্তহীনতা গোপালগঞ্জ সংঘাতকে অনিবার্য করে তুলেছিল। এসব তথ্য উঠে এসেছে বিবিসি বাংলার রিপোর্ট থেকে উদ্ধৃত করে।
সরকার গঠন করা ওই তদন্ত কমিটির সদস্য সাজ্জাদ সিদ্দিকী বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, প্রতিবেদনে মোট ৮–১০টি সুপারিশ উল্লেখ আছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঘটলে তা প্রতিরোধে পাঁচটি করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। যদিওকমিশন গোপালগঞ্জে কেন ও কার গুলিতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন—এ বিষয়ের তদন্ত করেনি; গুলির বিষয়টি কমিশনের কার্যপরিধিতে ছিল না।
ঘটনাপ্রবাহ: ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে এনসিপির সমাবেশে তীব্র সংঘর্ষ শুরু হলে গুলিতে পাঁচজন নিহত হন। ঘটনার পর সরকার সাবেক এক বিচারপতির নেতৃত্বে ছয় সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠন করে। কমিশনের কাজ ছিল—ঘটনার মূল কারণ নির্ণয়, দায়ী কতিপয় চিহ্নিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সুপারিশ দেওয়া। তদন্ত প্রতিবেদনটি সেপ্টেম্বরের শেষভাগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হলেও সরকারি পর্যায়ে তা জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা হয়নি।
সাজ্জাদ সিদ্দিকী জানান, ঘটনাক্রম বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছে যে সমাবেশের নামকরণই সংকট বাড়ানোর এক শুরু ছিল — সারাদেশের সমাবেশ হিসেবে ঘোষণা করা পরিবেশে গোপালগঞ্জে নাম পরিবর্তন করে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ করা হলে স্থানীয়ভাবে সেটি ভুল বোঝাবুঝি ও উসকানির জন্ম দেয়। অভিযুক্তদের আচরণ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এবং থানা কর্মকর্তার গাড়িতে হামলা, ককটেল বিস্ফোরণসহ প্রাক-ঘটনাগুলো ইঙ্গিত করছিল যে সমাবেশটি কোনোভাবেই চলতে দেয়া হবে না—আর এটাই উত্তেজনা তীব্র করে তুলেছিল।
সিদ্দিকীর ভাষ্যে, বাস্তবতার সঙ্গে এনসিপির পরিকল্পনার ব্যবধান, গোপালগঞ্জবাসীর একটি ট্রাইবাল মনোভাব এবং গতবারের রাজনীতিক পরিবর্তন—বিশেষ করে পাঁচ আগস্ট পরবর্তী দেশজুড়ে যে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে—এসব মেলবন্ধনই সংঘাতকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিল। এলাকার মানুষ ঠিকভাবে রাজনৈতিক নিদার্শনা বা বক্ত্যকে বিশ্লেষণ করতে না পারায় এ ধরনের ভুল বোঝাবুঝি জন্মায়, যা ঝুঁকিকে বাড়িয়েছে।
কমিশন দেখেছে, স্থানীয় স্থানে গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল—একাংশ ধারণা ছিল এনসিপি নেতারা হয়তো শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধি সম্পর্কে আপত্তিকর কোনো কর্মসূচি নেয়। সমাবেশের শেষদিকের সময়ে ‘মুজিববাদ মুর্দাবাদ’ স্লোগান শুনে স্থানীয়রা উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে এবং তা উত্তেজনা আরও বাড়ায়। সিদ্দিকী বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ একাডেমিকাল বিশ্লেষণের মতো বিষয়গুলোকে সেইভাবে উপলব্ধি করেন না; তাদের অনেকে সেটিকে সম্মুখীন হানাহানির সম্ভাব্য জোরালো ইঙ্গিত হিসেবে দেখে।
তদন্তে ব্যবহারিক পদ্ধতি: কমিশন নির্ভরযোগ্য প্রচারমাধ্যমে ছাপা ছবি, ভিডিও ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, নিহতদের পরিবারদের বয়ান বিশ্লেষণ করে। যাদের নাম বা পরিচয় ছবিতে, ভিডিওতে বা পত্রপত্রিকায় দেখা গেছে—তাদের অধিকাংশই রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল। স্থানীয় নেতাদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ একত্র হয়ে সমাবেশ বিরোধী আচরণে অংশ নিয়েছিল—এসব ঘটনাক্রম কমিশনের বিশ্লেষণে এসেছে।
কমিশন আরও লক্ষ্য করেছে, স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং রাজনৈতিক দলের মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাব ঘটনার তীব্রতাকে বাড়িয়েছে। অর্থাৎ শুধুমাত্র দুই পক্ষের উসকানি-প্রবণতা নয়, প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতাও সংঘাতের পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
সারমর্ম: গোপালগঞ্জ সংঘর্ষের দায় দুইপক্ষেরই—এখানে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মী এবং সমর্থকদের সক্রিয় ভূমিকার উল্লেখ আছে। প্রতিবেদনে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক তৎপরতা, গুজব প্রতিরোধ ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় সুপারিশগুলো তুলে ধরা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন অপঘাত প্রতিরোধ করা যায়।





