মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গ্যাসের তীব্র সংকট, বন্ধ হচ্ছে অনেক শিল্প-কারখানা

গ্যাসের তীব্র সংকট, বন্ধ হচ্ছে অনেক শিল্প-কারখানা

দেশজুড়ে শিল্প খাতে গ্যাসসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে শিল্প-কারখানা, আবাসিক, পরিবহনসহ প্রায় সব খাতে বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, সিরামিক, স্টিলসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী শিল্পে কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুটি এলএনজি টার্মিনালের একটি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এটিকেই চলমান সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

শিল্পোদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গ্যাস সরবরাহের ঘাটতির কারণে তাঁরা কারখানাগুলোয় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। এতে একদিকে যেমন উৎপাদন কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয় হুমকির মুখে পড়ছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে রপ্তানিপণ্য সরবরাহ করতে না পারায় অনেক প্রতিষ্ঠান চুক্তি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।

পরিস্থিতির কারণে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও অনেক শিল্পোদ্যোক্তা নতুন রপ্তানি কার্যাদেশ গ্রহণ বন্ধ বা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

পেট্রোবাংলা ও তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের মহেশখালীতে স্থাপিত ভাসমান দুটি এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি মেরামতে থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশে দুটি এলএনজি টার্মিনালের মোট সরবরাহ সক্ষমতা এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দুটি চালু থাকলে দৈনিক গড়ে সাড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি গ্রিডে যোগ হয়। বর্তমানে তা নেমে এসেছে সাড়ে ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় চার হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সেখানে স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ থাকে প্রায় দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নেমে আসে দুই হাজার ২৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। ফলে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এ বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘মেরামতে থাকা এলএনজি টার্মিনালটি থেকে গ্যাস সরবরাহ এরই মধ্যে চালু করা হয়েছে। তবে এর পূর্ণ প্রভাব পেতে প্রায় ২৪ ঘণ্টা লাগতে পারে। আজ (সোমবার) রাত ১২টা পর্যন্ত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। বর্তমানে ধাপে ধাপে গ্যাসের চাপ বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত লাইন ‘প্যাক’ হয়ে গ্যাস এসে ঢাকায় পূর্ণ চাপ তৈরি করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়।’

তিনি বলেন, ‘প্রায় ২৪ ঘণ্টা লাগতে পারে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে। গ্যাস স্বল্পতার প্রভাব আবাসিক খাতে বেশি অনুভূত হচ্ছে। তবে শুধু আবাসিক নয়, শিল্প খাতসহ সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়েছে। শিল্প-কারখানাতেও গ্যাসের ঘাটতির প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।’

রাজধানীর কুড়িল এলাকার বাসিন্দা খাইরুল শেখ বলেন, ‘দুই দিন ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চুলা জ্বলছে না। আগে সকালে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও দুপুর ও রাতে গ্যাস পাওয়া যেত। এতে ইলেকট্রিক চুলা দিয়ে রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে।’

এদিকে চট্টগ্রাম, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী এলাকার শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্প-কারখানা কখনো চলছে, কখনো বন্ধ থাকছে। শিল্পোদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, বেশ কিছুদিন ধরে গ্যাসসংকটে শিল্প খাতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে কয়েক শ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। রপ্তানি আয় কমেছে। বিনিয়োগ থমকে আছে। কর্মসংস্থান বাড়ছে না। শিল্প খাত না বাঁচলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থেমে যাবে। তাই শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে।

এ বিষয়ে সাভারের ডিইপিজেডের এফসিআই বিডি লিমিটেড কারখানার মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘সকাল থেকেই গ্যাসসংকটের কারণে আমাদের বয়লার, ওয়াশিংয়ের ড্রায়ার মেশিনসহ অনেক কিছুই চালাতে পারছি না। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করায় মালিকের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিদিন আমাদের ১১ হাজার ৩২৩ সিএফটি গ্যাসের চাহিদা থাকলেও আজ গ্যাসের চাপ নেই। সারা দিনে চাহিদার ২০ শতাংশ গ্যাসও আমরা পাচ্ছি না।’

অকোটেক্স গ্রুপের ডিজিএম হোসাইন খালেক বলেন, ‘গ্যাসের সমস্যা আমাদের জন্য মহামারি আকার ধারণ করেছে। গ্যাস না থাকায় কারখানা এক প্রকার বন্ধ রয়েছে বলা চলে। তবে কিছু কিছু ইউনিট ডিজেল দিয়ে চালানো হচ্ছে। এতে গ্যাসের মূল্যের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ অর্থ গুনতে হচ্ছে। প্রতিদিন বয়লার এবং জেনারেটর চালানোর জন্য ১৬ হাজার কিউবিক মিটার গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সেখানে গ্যাস না থাকায় এক দিনের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সাদমা গ্রুপের সাদমা ফ্যাশনওয়্যার কারখানায় গ্যাসের অনুমোদিত চাপ ১৫ পিএসআই। সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী কারখানাটি চালু রাখতে প্রয়োজন কমপক্ষে ১০ পিএসআই গ্যাস। গত রবিবার থেকে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক পিএসআইয়ের কম। গতকাল সকাল থেকে বন্ধ হয়ে যায় গ্যাস। বাধ্য হয়ে কর্তৃপক্ষ কারখানাটি বন্ধ রাখেন। উৎপাদন কমে যাওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়ে ব্যাংক ঋণের কিস্তি, শ্রমিকদের বেতন, পরিচালন ব্যয় নিয়ে কপালে দুশ্চিন্তা ভাঁজ দেখা দিয়েছে কর্তৃপক্ষের।

নাম না প্রকাশের শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের দৈনিক উৎপাদন ছিল ৪০ টন। গ্যাসসংকটের কারণে গত কয়েক দিনে তা ১০ টনে নেমে আসে। সোমবার কারখানা বন্ধ রাখার কারণে পুরো উৎপাদনই বন্ধ ছিল। এতে কমপক্ষে ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। সময়মতো রপ্তানি আদেশ সরবরাহ করতে না পারলে ক্রয়াদেশ বাতিল হতে পারে। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আসন্ন ঈদে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস প্রদানে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

শিল্প-কারখানার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসের ঘাটতি চলছিল। কিছুদিন আগেও যে পরিমাণ চাপ ছিল, তা দিয়ে কোনো রকমে কারখানা চালিয়ে নেওয়া যেত। গত এক মাস ধরে অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে চলে গেছে। গ্যাসের চাপ তিন ভাগের এক ভাগে নেমে এসে ছিল। ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।

নরসিংদীর শেখেরচর এলাকার এমআর টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ রুমন বলেন, ‘আমার পুরো কারখানা গ্যাসনির্ভর। এক সপ্তাহ ধরেই গ্যাসের চাপ কম। উৎপাদন ৩০ শতাংশ নেমে গেছে। গত রবিবার রাত ১০টা থেকে কারখানার ডাইং, ফিনিশিং, নিটিং, ডিজিটাল সব ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ। রমজানের আগে আমাদের জন্য পিক টাইম। আর এই সময় গ্যাসের এই সমস্যা আমাদের মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন করে দিচ্ছে।’

নরসিংদীর আবেদ টেক্সটাইল অ্যান্ড প্রসেসিং মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, গ্যাসের সরবরাহ কম থাকার কারণে আমার নিজের কারখানায় গত এক সপ্তাহে উৎপাদন ২০ শতাংশের নিচে চলে আসছে। বলা যায় এক প্রকার কারখানা বন্ধ রয়েছে।’

শেয়ার করুন