সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নভেম্বর থেকে আবার খুলছে পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন

৯ মাসের বন্ধের পর ১ নভেম্বর থেকে পর্যটকরা সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে তাদের মানতে হবে সরকারের প্রণীত ১২টি নির্দেশনা।

বঙ্গোপসাগরের বুকে আট বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিনে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে পর্যটকদের যাতায়াত বন্ধ ছিল। এবার নভেম্বর থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারবেন। সরকারি প্রজ্ঞাপনের অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে পর্যটকরা শুধুমাত্র দিনের বেলায় দ্বীপে থাকবেন; রাত যাপন নিষিদ্ধ। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের সুযোগ থাকবে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ১২টি নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে: বিআইডব্লিউটিএ এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না; পর্যটকরা বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনবেন, প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।

দ্বীপে ভ্রমণের সময়সূচি ও পর্যটক উপস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। ফেব্রুয়ারি মাসে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন না। রাতের সময়ে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল করা যাবে না।

নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না এবং একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান, শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন করা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানিয়েছেন, সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারের জারি করা ১২টি নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। নিরাপত্তার কারণে এখন টেকনাফের পরিবর্তে কক্সবাজার শহর থেকে পর্যটকবাহী জাহাজ দ্বীপে চলাচল করবে।

জাহাজমালিকদের সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক  জানিয়েছেন, কক্সবাজার-সেন্ট মার্টিন রুটে জাহাজ চলাচলের জন্য অনুমোদন প্রয়োজন। অনুমোদন মিললে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাহাজ চলাচল শুরু হবে। গত মৌসুমে তিন মাসে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করেছিলেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি পর্যন্ত পর্যটকরা দ্বীপে যেতে পারবেন। ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ৯ মাসের জন্য যাতায়াত আবার বন্ধ থাকবে।

শামুক-ঝিনুক ও পরিবেশের উন্নতি
পরিবেশ অধিদপ্তর জানায়, সেন্ট মার্টিনে ১ হাজার ৭৬ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য রয়েছে। অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো ও বিপুল পর্যটক সমাগমের কারণে দ্বীপটি সংকটাপন্ন হয়েছিল। ৯ মাস বন্ধ থাকার ফলে জীববৈচিত্র্য বিস্তার ও পরিবেশের উন্নতি হয়েছে। আগে সৈকতে ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচলের কারণে শামুক-ঝিনুকসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী মারা যেত। এখন দ্বীপে পর্যটক না থাকায় শামুক-ঝিনুকের বংশবিস্তার ঘটছে।

পরিবেশবিষয়ক সংগঠন ইয়ুথ এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির প্রধান ইব্রাহিম খলিল জানিয়েছেন, পর্যটক সীমিত করার প্রথম ৯ মাসে সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সৈকতে লাল কাঁকড়া, শামুক-ঝিনুকের বংশবিস্তার হয়েছে এবং মা কাছিমের ডিম পাড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

‘সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অভিযোজন প্রকল্প’ নামে ৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার প্রকল্প চলমান। প্রকল্প পরিচালক কামরুল হাসান জানান, প্রবাল-শৈবাল বিস্তার ভালোভাবে দেখা গেছে, শৈবাল ও চুনাপাথরের গায়ে অজস্র শামুক-ঝিনুক আছে। বালিয়াড়িতে প্যারাবন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে এবং বিভিন্ন প্রাণীর বিচরণ চোখে পড়েছে।

বিনিয়োগকারীদের ক্ষতি
নভেম্বর মাসে রাতযাপনের সুযোগ না দেওয়ার কারণে দ্বীপের হোটেল, রেস্তোরাঁ ও দোকানমালিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলে আশঙ্কা করছেন। দোকানমালিকরা বলেন, রাতযাপনের সুযোগ না থাকায় বেচাবিক্রি নেই, ৬০-৭০টি দোকান বন্ধ রয়েছে। হোটেল-রিসোর্ট মালিকরাশী জানান, পরিবেশ রক্ষার সিদ্ধান্ত স্বাগত, তবে বিনিয়োগকারীর ক্ষতি ও মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়ে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মো. জমির উদ্দিন জানান, পানীয় জলের সংকট নিরসন, কুকুরের প্রজনন ঠেকাতে বন্ধ্যাকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, বনায়ন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও নতুন জেটি নির্মাণসহ শত কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলছে। ডিসেম্বরের মধ্যে এগুলো শেষ হলে দ্বীপের মানুষের সংকট কমবে।

শেয়ার করুন