এর বাইরে কারাগার থেকে বের হওয়া অপরাধী বা সন্ত্রাসীদের ক্ষেত্রে আমাদের বিশেষ নজরদারি আছে। তারা যাতে নতুনভাবে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে, সেদিকটি দেখা হচ্ছে।এ জন্য এখন আমাদের সামনে চলমান সংঘাতগুলো কী কী—সেগুলো যাচাই করা জরুরি। একটি হলো সাধারণ অপরাধমূলক ব্যবহার; অর্থাৎ ‘পিওর ক্রাইম’ করার জন্য কিছু লোক অস্ত্র ব্যবহার করে। এ ধরনের অপরাধের জন্য চায়নিজ রাইফেলের মতো অস্ত্র আমদানি করে—এমন কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি। এমন অস্ত্র এসে থাকলে তা মূলত সশস্ত্র সংঘাত হয়, এমন এলাকায় যাচ্ছে। আরেকটি ক্ষেত্র হলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত। কয়েক দিন আগে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউপিডিএফ ও জেএসএসের মতো গোষ্ঠীগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এসব স্থানে অস্ত্রের চাহিদা রয়েছে। একইভাবে আরাকান আর্মিও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এসব অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। তাই দেশের ভেতরে এসব বড় ধাঁচের অস্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার হবে—এমন আশঙ্কা আমরা আপাতত কম ভাবছি। তবে কোনো আশঙ্কাকে আমরা অগ্রাহ্য করছি না; সব ধরনের আশঙ্কা মাথায় রেখে কাজ করে যাচ্ছি। আমি মামলার তদন্তকারী দলের সদস্যদের নিয়ে অঞ্চলভিত্তিক ও জেলায় জেলায় নিয়মিতভাবে মিটিং করছি। দীর্ঘদিন ধরেই এটা চালাচ্ছি। যেখানে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করে পুলিশকে নির্দেশ দিচ্ছি যাতে নিরপরাধদের দ্রুত মুক্তি দেওয়া যায়। এ জন্য প্রতিটি মিটিংয়ে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩(ক) ধারা অনুযায়ী কতটি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
কেউ নিজেকে নিরপরাধ উল্লেখ করে দায়মুক্তি চেয়ে দরখাস্ত না করলেও জেলা পুলিশ সুপারের উচিত স্বতঃপ্রণোদিতভাবে নিরপরাধদের মুক্তি দেওয়া—এটি আমি জোর দিয়েই বলছি। তবে নানা কারণে এ প্রতিবেদন দেওয়া নিয়ে পুলিশের মধ্যে একধরনের জড়তা ও দ্বিধা আছে। আমরা সেটা থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছি।
আমি প্রতিদিন যে দরখাস্তগুলো পাই, তা সংশ্লিষ্ট জেলায় পাঠাই এবং কেন্দ্র থেকে তদারকি করি। ১৩৬টি অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে। আরও প্রায় ২৩৬টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ প্রক্রিয়া চলমান। অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা অনেক পুলিশ সদস্যের ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। কেউ কেউ কর্মস্থলে এক জায়গায় থেকে অন্য জায়গায় হয়রানিমূলকভাবে আসামি হয়েছেন। আমি তাগাদা দিচ্ছি যে এই জায়গায়ও আমাকে ন্যায়বিচার দিতে হবে। কারণ, আমার বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ফেরানোর ক্ষেত্রে এটাও অনেক বড় একটা ইস্যু। পুলিশপ্রধান হিসেবে সেটা আমাকে দেখতে হবে।হয়রানিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে কিছু আইনগত জটিলতা আছে। যদি মামলা সম্পূর্ণ মিথ্যা হয়, তাহলে আইনে শাস্তির ব্যবস্থা আছে। কিন্তু ঘটনা সত্যি, কেবল নিরপরাধদের নাম যুক্ত করা হয়েছে—এমন হলে কোনো স্পষ্ট আইনি বিধান নেই। তবু যেখানে প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে প্রতারণা বা বেআইনি প্রভাব খাটানোর বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নিচ্ছি। অপরাধ দমন শুধু বলপ্রয়োগে সম্ভব নয়; কৌশল ও পরিকল্পনার মাধ্যমে কাজ করতে হয়। জনসমক্ষে ঘটে এমন অপরাধ—যেমন ছিনতাই, অজ্ঞান পার্টির কার্যক্রম বা প্রতারণা প্রতিরোধে পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ যত বেশি দৃশ্যমান থাকবে, অপরাধীরা তত বেশি সতর্ক থাকবে।
ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় দুই হাজার পুলিশ রাস্তায় থাকে, বড় সমাবেশে সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। তবু বিপুল জনসংখ্যার ভিড়ে পুলিশের উপস্থিতি অনেক সময় চোখে পড়ে না। তাই আমরা ভাবছি—প্যাট্রোল গাড়িগুলো যেন মানুষের দৃষ্টি ও শ্রুতিতে থাকে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে পুলিশ আশপাশে রয়েছে—এ জন্য হুডার বাজানো হবে। তবে এতে শব্দদূষণের সমস্যা হতে পারে, তাই সব দিক বিবেচনা করছি। দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের প্রযুক্তিনির্ভর হতে হবে। কয়েক দিন আগে স্বরাষ্ট্রসচিব গিয়েছিলেন পাকিস্তানে। তিনি এসে জানালেন, পাকিস্তানে ‘নিরাপদ শহর প্রকল্প’-এর মতো উদ্যোগ অপরাধ দমনে ভালো ফল দিচ্ছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পুরো শহরটাকে তারা ক্যামেরা দিয়ে একেবারে ছেয়ে ফেলেছে। এতে ভয়ে সেখানে জনসমক্ষে অপরাধ করাটা কমে গেছে। আমরা সে রকম উদ্যোগ বিবেচনা করছি। ইতিমধ্যে ট্রাফিক ও নির্বাচনী কাজে ব্যবহারের জন্য কিছু ‘বডি অন ক্যামেরা’ চালু করেছি। ভবিষ্যতে পুলিশ সদস্যরা মাঠে নামলে, মামলা তদন্ত হোক বা নিরাপত্তা দায়িত্ব—সবার শরীরে থাকবে এই ক্যামেরা। মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করাসহ পুলিশের বিরুদ্ধেও তো অনেক অভিযোগ। প্রযুক্তিনির্ভর এসব উদ্যোগ একদিকে পুলিশ সদস্যকে শৃঙ্খলাবদ্ধ রাখবে, অন্যদিকে জনগণের সঙ্গে পুলিশের আচরণ ও কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। হ্যাঁ, দেশে অনেকের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের কথোপকথন আমরা পেয়েছি। বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে কথা বলে তাদের তারা উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে। তবে যারা পালিয়ে গেছে, তারা কিন্তু সংখ্যায় খুব বেশি না। আর তাদের ইমেজটাও খুব বাজে। এ জন্য এই যোগাযোগ খুব ভীতিকর কিছু না।
রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে উসকে দেওয়ার কিছু ঘটনায় হয়তো পালিয়ে যাওয়া কেউ কেউ যুক্ত। সে ক্ষেত্রে ওই কর্মীদের আশ্বস্ত করে এমন বলা হয়, ‘পুলিশের সঙ্গে কথা বলা আছে, তারা তোমাদের কিছু করবে না।’ পুলিশের নিচের দিকের পদগুলোতে থাকা কারও কারও সঙ্গে এমন যোগাযোগের তথ্য আমরা পেয়েছি। কারও কারও বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থাও নিয়েছি। প্রমাণ পাওয়ার পরে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করে চাকরি থেকে বের করার প্রক্রিয়ায় আছে কিছু কিছু। তবে ঊর্ধ্বতন পদে থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগের এমন প্রমাণ আমরা পাইনি। এ জন্য যোগাযোগ করে তারা কোনো দুষ্কর্ম করবে অথবা অস্থিরতা তৈরি করতে পারবে, সেটা আমার কাছে মনে হয় না।





