ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেশটির ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থি প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিক্ষোভে জড়িত জনগোষ্ঠীকে ‘মোহারেব’ বা ‘আল্লাহর শত্রু’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে সরকার। সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ্যে জানানো হয়েছে।
শনিবার ইরানের অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়, সংবিধানের ১৮৬ নম্বর অনুচ্ছেদের আলোকে বিক্ষোভকারীদের ‘মোহারেব’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণকারীদের জন্য আইন অনুযায়ী একমাত্র শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদণ্ড।
ইরানের সংবিধানের উক্ত ধারায় বলা হয়েছে, কোনো দল বা সংগঠন যদি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে বা সে ধরনের কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকে, তবে ওই সংগঠনের সব সদস্যকে ‘আল্লাহর শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে ইরানজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে সরকারবিরোধী আন্দোলন। সময় যত গড়াচ্ছে, বিক্ষোভ ততই বিস্তৃত ও সহিংস হয়ে উঠছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিনই নতুন নতুন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে।
এই আন্দোলনের মূল কারণ দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট। লাগাতার অবমূল্যায়নের ফলে ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়েল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম দুর্বল মুদ্রায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়েলের বিনিময় হার প্রায় ৯ লাখ ৯৪ হাজার ছাড়িয়েছে, যা দেশটির অর্থনীতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
মুদ্রার এই চরম দুরবস্থার কারণে ইরানে ভয়ংকর মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। খাদ্যপণ্য, পোশাক, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাপন দিন দিন আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানী তেহরানের বিভিন্ন বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ধর্মঘটের ডাক দেন। মূলত সেই ধর্মঘট থেকেই দেশব্যাপী আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।
পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যেই এই বিক্ষোভ ইরানের ৩১টি প্রদেশের প্রায় সব শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের তীব্রতা এতটাই বেড়েছে যে অনেক এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে এবং দেশ কার্যত অচল অবস্থায় পৌঁছেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। রাজধানীসহ দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শহরে বিপুল সংখ্যক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দিয়েছে, যাতে আন্দোলনকারীরা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে।
শনিবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি সেনাবাহিনী এবং তাদের বিশেষ বাহিনী ইসলামিক রিপাবলিক গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) মাঠে নামানো হয়। ওই রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।





