রোববার (২১ ডিসেম্বর) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানান পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। এ সময় তিনি ভারতের পক্ষ থেকে প্রকাশিত প্রেস নোটের কড়া সমালোচনা করেন।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ভারতের প্রেস নোটে যে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে, তা বাংলাদেশ সরকার সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, বিষয়টিকে যেভাবে সহজভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবতা মোটেও তেমন নয়। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনটি সম্পূর্ণভাবে কূটনৈতিক এলাকার ভেতরে অবস্থিত, কোনো প্রান্তবর্তী বা উন্মুক্ত স্থানে নয়। অথচ সেখানে একটি দল প্রবেশ করেছে সংখ্যা ২০-২৫ জন বা তারও বেশি হতে পারে।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, একটি সুরক্ষিত কূটনৈতিক এলাকায় কীভাবে ২৫ জনের একটি হিন্দু চরমপন্থি গোষ্ঠীর সদস্য এতদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে? এর অর্থ হলো, কোনো না কোনোভাবে তাদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যদিও সেখানে তাদের আসার কথা ছিল না। তারা কেবল কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে চলে গেছে এমনটিও নয়। সেখানে তারা আরও নানা ধরনের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিল, যা বাংলাদেশের জানা আছে বলে জানান তিনি।
হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকির বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, সরাসরি প্রমাণ তার কাছে নেই যে হাইকমিশনারকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তবে এমন হুমকির কথা শোনা গেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার বক্তব্য হলো, মূল প্রশ্ন হচ্ছে তারা সেখানে পৌঁছাতে পারল কেন এবং কীভাবে এসে হুমকির পরিবেশ তৈরি করল। এ ধরনের ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তৌহিদ হোসেন আরও বলেন, ঘটনাটিকে এমনভাবে দেখানো হচ্ছে যেন তারা শুধু এসে কিছু স্লোগান দিয়ে চলে গেছে। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। ওই কূটনৈতিক ভবনের ভেতরেই হাইকমিশনার ও তার পরিবার বসবাস করেন। এ ঘটনার ফলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছেন এবং আতঙ্কিত হয়েছেন। সেখানে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না; মাত্র দুজন নিরাপত্তা কর্মী উপস্থিত ছিলেন, যারা কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখেননি। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট দেশের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নিয়মকানুন এ ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে বাংলাদেশের ধারণা। ভারত দাবি করছে যে তারা সব মিশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে এই বক্তব্য বাংলাদেশ নোট করেছে বলেও জানান তিনি।
হাইকমিশনে হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ নিয়ে ভারতীয় পক্ষ যে আপত্তি তুলেছে, তা প্রত্যাখ্যান করেন তৌহিদ হোসেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো মোটামুটি সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই করা হয়েছে। সেগুলো ভুলভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এমন দাবি সত্য নয়।
ময়মনসিংহে দীপু চন্দ্র দাসের নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, তিনি একজন বাংলাদেশি নাগরিক এবং অত্যন্ত নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনাকে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার ইস্যুর সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছে এবং ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের অপরাধ শুধু বাংলাদেশে নয়, এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও ঘটে এবং প্রতিটি দেশের দায়িত্ব হলো দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। বাংলাদেশ সেই দায়িত্ব পালন করছে।
ঢাকা কীভাবে প্রতিবাদ জানাবে বা ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় দূতকে তলব করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রতিবাদের ফরম্যাট নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা করা সমীচীন নয়। তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত আছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বাংলাদেশ তার অবস্থান স্পষ্ট করছে এবং ভবিষ্যতে কী করা হবে, তা সরকারের ওপরই ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তার ভাষায়, তিনি যা বলছেন, তা সরকারের অবস্থানই প্রতিফলিত করে।
ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্কের টানাপড়েনের প্রেক্ষাপটে ভারতে বাংলাদেশের মিশন ছোট করে আনার বিষয়টি বিবেচনায় আছে কি না এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, পরিস্থিতি যদি সে রকম হয়, তাহলে বাংলাদেশ সে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ আশা করছে, ভারত যথাযথ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।





