সোমবার, ২২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

আজ মহান বিজয় দিবস: নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়

বাংলাদেশ ও ভারতে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে আজ ১৬ ডিসেম্বর পালিত হচ্ছে মহান বিজয় দিবস। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দিনটিকে বাংলাদেশের জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং এটি সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গণ্য। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রায় ৯১ হাজার ৬৩৪ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে। এর মধ্য দিয়ে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের অবসান ঘটে এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

প্রতি বছর এই দিনটি বাংলাদেশে যথাযথ মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে পালিত হয়। ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের সূচনা হয়। জাতীয় প্যারেড স্কয়ারে অনুষ্ঠিত সম্মিলিত সামরিক কুচকাওয়াজে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা অংশ নেন। রাষ্ট্রপতি অথবা প্রধানমন্ত্রী কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করেন। কুচকাওয়াজ প্রত্যক্ষ করতে বিপুলসংখ্যক মানুষ সেখানে সমবেত হন।

মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে ঢাকার সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী, বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

পটভূমি

১৯৭১ সালে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। ঢাকার কেন্দ্রস্থল রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানের পক্ষে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। তিনি যৌথবাহিনীর প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। ওই অনুষ্ঠানে মুক্তিবাহিনীর উপ-সর্বাধিনায়ক ও ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবদুল করিম খোন্দকার উপস্থিত ছিলেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল ওসমানী সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। অনেকের মতে, ভারত সরকারের আপত্তির কারণেই তিনি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারেননি।

আত্মসমর্পণ দলিলে উল্লেখ করা হয়, পূর্ব রণাঙ্গনে ভারতীয় ও বাংলাদেশ বাহিনীর জেনারেল অফিসার কমান্ডিং ইন চিফ লেফটেন্যান্ট-জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক কমান্ড বাংলাদেশে অবস্থানরত সব পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীসহ আত্মসমর্পণে সম্মত হয়েছে। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী ছাড়াও সব আধা-সামরিক ও বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রেও এই আত্মসমর্পণ কার্যকর হবে। আত্মসমর্পণের শর্ত লঙ্ঘন করলে যুদ্ধের প্রচলিত আইন ও রীতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও দলিলে উল্লেখ করা হয়।

এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে নয় মাসব্যাপী স্বাধীনতা যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতার মাসেই জাতিসংঘভুক্ত প্রায় সব দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।

উদযাপন

দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশেষ বাণী দিয়েছেন। এছাড়া যথাযোগ্য মর্যাদায় বিজয় দিবস পালনে জাতীয়ভাবে দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনও নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করবে। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনও বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করবে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হবে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। সব সরকারি-আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাগুলো আলোকসজ্জায় সজ্জিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৪ বছর উদযাপনে সর্ববৃহৎ পতাকা-প্যারাস্যুটিং দেখবে বিশ্ব। বিজয় দিবসে সকাল ১১টা থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরান বিমানবন্দরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী পৃথকভাবে ‘ফ্লাই পাস্ট’ মহড়া পরিচালনা করবে। এই আয়োজন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। একইসঙ্গে এদিন চলবে বিজয় দিবসের বিশেষ ব্যান্ড-শো। সকাল ১১টা ৪০ মিনিট থেকে ‘টিম বাংলাদেশ’-এর ৫৪ জন প্যারাট্রুপার স্বাধীনতার ৫৪ বছর উদযাপনে পতাকা হাতে প্যারাস্যুটিং করবেন।

মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে গত বছরের মতো এবারও দেশের সব জেলা-উপজেলায় তিন দিনব্যাপী বিজয়মেলা অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিশুদের অংশগ্রহণে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক রচনা, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করবে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়।

অপরদিকে, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ১৫ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকাল ৩টায় আ্যাক্রোবেটিক শো ও সন্ধ্যা ৬টায় যাত্রাপালা “জেনারেল ওসমানী” অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৩টা থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পরিবেশিত হবে বিজয় দিবসের গান। পাশাপাশি, সারা দেশের ৬৪ জেলায় একযোগে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান পরিবেশন করবেন নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা। ঢাকাসহ সারা দেশের সিনেমা হলগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের বিনা টিকিটে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং মিলনায়তন ও উন্মুক্ত স্থানে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

সরকারি ও বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার জাদুঘরগুলোতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিনা টিকিটে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। দেশের সব সরকারি ও বেসরকারি বিনোদনমূলক স্থান শিশুদের জন্য সকাল-সন্ধ্যা উন্মুক্ত রাখা ও বিনা টিকিটে প্রবেশের ব্যবস্থা থাকবে।

সারা দেশে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডা ও অন্যান্য উপাসনালয়ে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য কামনা করে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে।

বিজয় দিবসকে ঘিরে উল্লেখযোগ্য ঘটনা

১৯৭১ সালে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক রাখা হয়।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান।
১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গেজেটের মাধ্যমে স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য রাষ্ট্রীয় খেতাব ঘোষণা করা হয়।
১৯৯৬ সালে বিজয়ের ২৫ বছর পূর্তি উদযাপন করা হয়।
২০১৩ সালে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে ২৭ হাজার ১১৭ জন স্বেচ্ছাসেবী লাল-সবুজের ব্লক নিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম মানব পতাকার নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়ে।
২০২১ সালে দেশব্যাপী উদযাপিত হয় মহান বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী।

শেয়ার করুন