বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

খন্দকার এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে ১০৭ কোটি টাকার মানিলন্ডারিং মামলা

ঢাকা সড়ক পরিবহণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও এনা ট্রান্সপোর্টের মালিক খন্দকার এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে ১০৭ কোটি টাকার মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযোগ অনুযায়ী, এ টাকা চাঁদাবাজির মাধ্যমে উপার্জিত।

সিআইডি জানায়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে তার ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তোলার প্রমাণ পাওয়ার পর মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) রমনা থানায় সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট মামলা দায়ের করে। বুধবার (২৬ নভেম্বর) দুপুরে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান এ তথ্য জানান।

তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান খন্দকার এনায়েত উল্লাহ আশির দশকে পরিবহণ সেক্টরে যাত্রা শুরু করেন। একটি পুরাতন বাস কেনার মাধ্যমে ব্যবসার সূচনা হলেও কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি প্রায় ২০টি বাসের মালিক হন। অল্প সময়েই পরিবহণ মালিকদের সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছে রাজনৈতিক প্রভাবও বাড়িয়ে নেন। প্রথমে বিএনপি, পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে ঢাকা দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি পদও লাভ করেন।

সিআইডির কর্মকর্তা জানান, রাজনৈতিক পরিচয় তাকে আরও বেপরোয়া করে তোলে। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত তিনি ঢাকা সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব ছিলেন। এই দীর্ঘ ১৬ বছরে তিনি সংগঠনের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে পরিবহণ খাতে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন। বিভিন্ন হরতাল–অবরোধে পরিবহণ সচল রাখার ঘোষণা দিলেও নিজের কোম্পানির বাস রাস্তায় না নামানো ছিল কৌশলের অংশ।

জসীম উদ্দিন খান জানান, চাঁদাবাজি কার্যক্রম ছিল পরিকল্পিত ও ভয়ভীতিনির্ভর। সিন্ডিকেট গড়ে বিভিন্ন অজুহাতে বাস মালিকদের কাছ থেকে প্রকাশ্য চাঁদা আদায় করা হতো। দৈনিক ও মাসিক চাঁদার পাশাপাশি নতুন বাস রুটে নামাতে হলে ২ থেকে ৫ লাখ টাকা দিতে হতো। নতুন বাস কেনার সময় মালিকদের সেই বাসের একটি অংশ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল, না হলে বাসটি রাস্তায় চলতে পারত না। ফলে কোম্পানি বিক্রির সময়ও মালিকদের অতিরিক্ত টাকা পরিশোধ করতে হতো।

সিআইডির মুখপাত্র বলেন, ঢাকার প্রতিটি বাস টার্মিনাল তার নিয়ন্ত্রণে ছিল। শুধু রাজধানী নয়, সারা দেশের বাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতিগুলো থেকেও ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করা হতো। সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ব্যবহার করে পরিবহণ সেক্টরে ত্রাস সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। বিএফআইইউ, ব্যাংক, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসসহ বিভিন্ন উৎসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধানমন্ডির দুটি ফ্ল্যাট ও রূপগঞ্জের দুটি প্লট আদালতের আদেশে ক্রোক করা হয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এছাড়া ৫৩টি ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে, যার মোট স্থিতি প্রায় ১১০ কোটি টাকা। এই আদেশ ৩ জুলাই কার্যকর করা হয়।

সিআইডির বিশ্লেষণে দেখা যায়, খন্দকার এনায়েত উল্লাহ ও তার পরিবারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ১৯৯টি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, উত্তোলন হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে এনা ট্রান্সপোর্টের ৪৩টি হিসাবে জমা ৯৩৪.০৪ কোটি টাকা, উত্তোলন ৯০৬.৯৬ কোটি টাকা। এনা ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ৮টি হিসাবে জমা ৪১০.৩৮ কোটি টাকা, উত্তোলন ৪০৮.২৫ কোটি টাকা। ব্যক্তিগত ৭৪টি হিসাবে জমা ৪৫৯.০৮ কোটি টাকা, উত্তোলন ৪০২.৭৩ কোটি টাকা। সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে আসে—‘স্ট্রাকচারিং’ বা ‘স্মার্ট লেয়ারিং’ কৌশলে চাঁদাবাজির টাকা ঘুরিয়ে মোট ১০৭ কোটি ৩২ লাখ ৬১ হাজার ৭৪ টাকা মানিলন্ডারিং করা হয়েছে।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া সত্যতা বিবেচনায় ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট রমনা থানায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে খন্দকার এনায়েত উল্লাহসহ পাঁচ সহযোগীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

শেয়ার করুন