বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

মনিরামপুরে ভোটের রাজনীতি: শক্তির চেয়েও বড় হয়ে উঠছে বিভাজন

জেমস আব্দুর রহিম রানা, যশোর প্রতিনিধি :
যশোর–৫ (মনিরামপুর) আসনটি আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্রমেই জটিল ও অনিশ্চিত এক রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ নির্বাচনী এলাকা মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে এখানে চলছে তীব্র হিসাব-নিকাশ, ভাঙন, সমঝোতা ও কৌশলগত অপেক্ষার রাজনীতি। এই আসনে জয়-পরাজয়ের প্রশ্ন এখন আর কোনো একক দলের শক্তির ওপর নির্ভর করছে না; বরং নির্ভর করছে কে কতটা নিজের বিভাজন সামাল দিতে পারে এবং কে অন্যের দুর্বলতাকে কতটা কাজে লাগাতে পারে তার ওপর। মনিরামপুরে বিএনপি এখনো বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই বিবেচিত। অতীতের নির্বাচন ও ভোটের ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দলটি ঐক্যবদ্ধ থাকলে এখানকার ফলাফল সাধারণত তাদের পক্ষেই ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই ঐক্যই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঠপর্যায়ে বিএনপির ভেতরের দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
একদিকে দলীয় প্রতীক ধানের শীষের প্রার্থী, অন্যদিকে একই রাজনৈতিক ঘরানার স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং এর বাইরে একটি বড় অংশ নীরব ও অনিশ্চিত ভোটারে রূপ নিচ্ছে। এই তিনমুখী বিভাজন বিএনপির ভোটব্যাংককে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং দলটির সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। অনেক ভোটারই এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি, আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া থেকেও বিরত রয়েছেন। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিএনপির ঐতিহ্যগত শক্তিই শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অবস্থান এবার ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি। দলটির নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে মনিরামপুরে তাদের ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক একটি অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছে।
এই ভোট কোন দিকে যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের সমর্থক ভোটারদের একটি অংশ বিকল্প শক্তির সন্ধাপনে রয়েছে, আবার আরেক অংশ নীরব অবস্থান নিয়েছে। এই শূন্যতা মনিরামপুরের নির্বাচনী সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং নতুন শক্তির উত্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। এই রাজনৈতিক শূন্যতার মধ্যেই জাতীয় পার্টির প্রার্থী এম এ হালিম মনিরামপুরে শক্ত অবস্থান তৈরিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অনুপস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছেন তিনি। মাঠপর্যায়ে সক্রিয় প্রচারণা, দলীয় নেতাকর্মীদের সংগঠিত করা এবং সম্ভাব্য বিভ্রান্ত ভোটারদের নিজের পক্ষে টানার কৌশলে তিনি এগোচ্ছেন। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটের একটি অংশ যদি জাতীয় পার্টির দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে এম এ হালিম এই আসনে বাস্তব প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেন। মনিরামপুরের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির এই সক্রিয়তা এখন আর প্রান্তিক কোনো বিষয় নয়; বরং এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নীরবে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে আলোচনায় উঠে আসছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের ভূমিকা।
দুটি দলেরই এখানে একটি স্থিতিশীল ও নিবেদিত ভোটব্যাংক রয়েছে, যা সাধারণত শেষ পর্যন্ত দলীয় সিদ্ধান্তের সঙ্গেই থাকে। আলাদা আলাদা অবস্থানে থাকলে এই ভোটের প্রভাব সীমিত পর্যায়েই থাকে, কিন্তু যদি কোনোভাবে জোটগত সিদ্ধান্তে পৌঁছে একক প্রার্থী দেওয়া হয়, তাহলে পুরো নির্বাচনী সমীকরণ আমূল বদলে যেতে পারে। বিএনপির বিভক্তি, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী অনুপস্থিতি এবং জাতীয় পার্টির নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টার মাঝে এই ইসলামী ভোটব্যাংক মনিরামপুরে একটি কার্যকর বিকল্প শক্তি হয়ে উঠতে পারে। স্থানীয় রাজনীতিতে এই সম্ভাবনাকে এখন আর কেবল গুজব হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং এটি একটি বাস্তব দৃশ্যপট হিসেবেই আলোচিত হচ্ছে। মনিরামপুরের রাজনীতিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম দৃশ্যমান শক্তি হলো নীরব ভোটার। এরা প্রকাশ্যে কোনো দলে অবস্থান নিচ্ছেন না, প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন না, কিন্তু সংখ্যায় উল্লেখযোগ্য। আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত, বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং একাধিক বিকল্প শক্তির উপস্থিতির কারণে এই নীরব ভোটারের সংখ্যা আরও বেড়েছে।
শেষ মুহূর্তে তারা কোন দিকে ঝুঁকবেন, সেটিই নির্বাচনের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এই নীরব অংশই অনেক সময় হঠাৎ করে নির্বাচনের গতিপথ বদলে দেয়। সব মিলিয়ে মনিরামপুর আসনের চিত্র এখনো স্থির নয়। এখানে জয় নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর বিএনপি কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিজেদের বিভাজন সামাল দিতে পারে, জাতীয় পার্টি আওয়ামী ভোটের শূন্যতা কতটা কাজে লাগাতে পারে, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন কোনো যৌথ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে কি না এবং নীরব ভোটাররা শেষ মুহূর্তে কোন দিক বেছে নেন। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে মনিরামপুরের রাজনৈতিক ভাগ্য।
এই বাস্তবতায় মনিরামপুর আর শুধু একটি নির্বাচনী আসন নয়; এটি হয়ে উঠেছে বিভক্ত রাজনীতি, কৌশলগত সিদ্ধান্ত, সাংগঠনিক শূন্যতা ও অনিশ্চিত ভোটারের একটি জীবন্ত উদাহরণ। এখানে জয় আসবে না কেবল জনপ্রিয়তা দিয়ে আসবে রাজনৈতিক হিসাব, সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত এবং অন্যের দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর দক্ষতার মাধ্যমে।
শেয়ার করুন