দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পর ফুটবল বিশ্বকাপে ফেরার গৌরব অর্জন করেছে হাইতি। ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবারের মতো ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে অংশ নিতে যাচ্ছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের এই দেশটি। ঐতিহাসিক এই সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন দলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার রিকার্ডো আদে, যিনি মাঠের ভেতরে ও বাইরে দলের প্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে হাইতির পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত কারণে নিজেদের মাঠে খেলার সুযোগ না পেয়ে সব ম্যাচই খেলতে হয়েছে কুরাসাওয়ে। দীর্ঘ ভ্রমণ, অপরিচিত পরিবেশ ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ় মানসিকতা দেখিয়ে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে দলটি।
ফিফাকে দেওয়া সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আদে বলেন, হাইতির মানুষের জীবন মানেই সংগ্রাম। তার ভাষায়, “আমাদের জীবনে কিছুই সহজভাবে আসে না। পরিবর্তনের স্বপ্নে লড়াই করাই আমাদের স্বভাব। সেই মানসিকতা নিয়েই আমরা বিশ্বকাপের মাঠে নামব।” তিনি জানান, দেশের বাস্তবতা থেকেই এই লড়াকু মনোভাব গড়ে উঠেছে।
ড্র অনুযায়ী গ্রুপ ‘সি’-তে পড়েছে হাইতি, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ব্রাজিল, আফ্রিকার অন্যতম সেরা দল মরক্কো এবং ইউরোপের প্রতিনিধিত্বকারী স্কটল্যান্ড। কাগজে-কলমে কঠিন এই গ্রুপ নিয়েও আত্মবিশ্বাসী আদে। তিনি বলেন, “বিশ্বকাপে সহজ কোনো গ্রুপ বলে কিছু নেই। আমরা ধাপে ধাপে এগোতে চাই। প্রতিপক্ষ যত বড়ই হোক, তাদের বিপক্ষে লড়াই করার সক্ষমতা আমাদের আছে।”
রিকার্ডো আদের ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারও সংগ্রামে ভরা। স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি দেশ ছাড়লেও শুরুটা ছিল অনিশ্চয়তায় পূর্ণ। থাইল্যান্ডে যাওয়ার পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের লোয়ার ডিভিশনে খেলেই চালিয়ে যেতে হয় তার ফুটবল জীবন। অবশেষে ২৬ বছর বয়সে চিলির ক্লাব সান্তিয়াগো মর্নিংয়ের সঙ্গে প্রথম পেশাদার চুক্তি পান তিনি। সেখান থেকে তার ক্যারিয়ার গতি পায়। পরবর্তীতে ইকুয়েডরের ঐতিহ্যবাহী ক্লাব এলডিইউ কুইটোতে যোগ দেন এবং ২০২৩ সাল থেকে সেখানেই নিয়মিত খেলছেন।
বিশ্বকাপে ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়ার বিষয়টি আদের কাছে বিশেষ আবেগের। ২০০৪ সালে ‘গেম অব পিস’ নামের একটি প্রীতি ম্যাচ খেলতে ব্রাজিল দল হাইতিতে এসেছিল। তখন আদের বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। রোনালদিনহো, রোনালদো ও রবার্তো কার্লোসদের খেলা তিনি দেখেছিলেন টেলিভিশনের পর্দায়। সেই ব্রাজিলের বিপক্ষেই এবার বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলতে নামার সুযোগ পাওয়া তার কাছে স্বপ্নের মতো।
আদে বলেন, “ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা খেললে হাইতিতে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। তাদের বিপক্ষে মাঠে নামা সত্যিই অবিশ্বাস্য অনুভূতি। ঈশ্বর আমাকে এই সুযোগ দিয়েছেন, এজন্য আমি কৃতজ্ঞ।”
এর আগেও দক্ষিণ আমেরিকার পরাশক্তির বিপক্ষে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে আদের। ২০১৮ সালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে লা বোম্বোনেরা স্টেডিয়ামে মাঠে নেমেছিল হাইতি। লিওনেল মেসির অসাধারণ নৈপুণ্যে সেই ম্যাচে ৪-০ গোলে পরাজিত হয় তারা। সেই স্মৃতি এখনো তার মনে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
ভবিষ্যতে বিশ্বকাপে যদি আরও কোনো তারকার বিপক্ষে খেলতে চান, আদের পছন্দ পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তাকে নিজের আদর্শ হিসেবেই দেখেন এই হাইতিয়ান ডিফেন্ডার।
আগামী ১৩ জুন বোস্টনের স্টেডিয়ামে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে হাইতি। মাঠে নামবে ১১ জন ফুটবলার, তবে তাদের পেছনে থাকবে পুরো একটি জাতির আশা, স্বপ্ন আর সংগ্রামের গল্প।





