বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শীতের হলুদ রঙে সেজেছে গোদাগাড়ীর সরিষার মাঠ, মৌমাছির ব্যস্ততা আর কৃষকের আশার গল্প

অপু দাস, স্টাফ রিপোর্টার :
শীতের সকালে কুয়াশা ভেদ করে যখন নরম রোদ মাঠে পড়ে, তখনই ধীরে ধীরে বদলে যায় গোদাগাড়ীর গ্রামীণ দৃশ্যপট। শিশিরভেজা জমিতে চোখ মেললেই দেখা যায় দিগন্তজুড়ে বিস্তৃত হলুদ আভা। বাতাসে ভেসে বেড়ায় সরিষা ফুলের মিষ্টি সুবাস, আর সেই গন্ধের টানে মাঠজুড়ে ছুটে আসে অগণিত মৌমাছি। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাঠগুলো এখন যেন প্রকৃতির হাতে আঁকা এক বিশাল ক্যানভাস যেখানে হলুদই হয়ে উঠেছে প্রধান রং।
দূর থেকে তাকালে মনে হয়, গোটা মাঠজুড়ে কেউ বিছিয়ে দিয়েছে হলুদ রঙের চাদর। কোথাও কোথাও সরিষা ক্ষেতের পাশে সারি সারি মৌচাষের বাক্স বসানো হয়েছে। মৌমাছিদের নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াতে চারপাশে তৈরি হয়েছে এক কর্মচঞ্চল পরিবেশ। কৃষকের পরিশ্রম আর প্রকৃতির সহায়তায় গোদাগাড়ীর গ্রামীণ জনপদে ফিরে এসেছে প্রাণচাঞ্চল্য।
শীতকালেই সরিষা ফুলের মৌসুম কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, সরিষা ফুল সাধারণত শীতকালেই ফোটে। নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সময়টিই সরিষা ফুল ফোটার প্রধান মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এই সময় বিস্তীর্ণ মাঠ হলুদ ফুলে ঢেকে যায়, যা একদিকে প্রকৃতির অনন্য সৌন্দর্য তুলে ধরে, অন্যদিকে কৃষকের জন্য নিয়ে আসে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা।
সরিষার বীজ সাধারণত মধ্য আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসে (অক্টোবর-নভেম্বর) বপন করা হয়। বপনের পর শীতের শুরুতে গাছে ফুল আসে। শীতের মাঝামাঝি সময়টিই সরিষা সংগ্রহ ও মৌমাছির মধু আহরণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময় বলে মনে করেন কৃষক ও মৌচাষিরা। সরিষা চাষে ফিরেছে আগ্রহ চলতি মৌসুমে গোদাগাড়ীতে সরিষা চাষে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ভোজ্যতেলের দাম বৃদ্ধি এবং সরকারি কৃষি প্রণোদনার কারণে অনেক কৃষক এবার সরিষা চাষে ঝুঁকেছেন। ফলে আগের বছরের তুলনায় আবাদি জমির পরিমাণও বেড়েছে।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এ বছর গোদাগাড়ীতে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটির এই অঞ্চলে সরিষা ভালো ফলন দেওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
মৌমাছির গুঞ্জনে বাড়তি সুফল সরিষা ফুলে মৌমাছির আনাগোনা শুধু দৃশ্যের সৌন্দর্যই বাড়াচ্ছে না, বরং ফলন বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক কৃষক সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌচাষের বাক্স স্থাপন করেছেন। এতে একদিকে খাঁটি মধু পাওয়া যাচ্ছে, অন্যদিকে মৌমাছির পরাগায়নের ফলে সরিষার দানা বেশি ও ভারী হচ্ছে।
একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, “শীতকালে সরিষা ফুল আর মৌমাছি একে অপরের জন্য খুব উপকারী। ফুল যত বেশি হবে, মৌমাছিও তত বেশি আসবে। এতে মধুও পাওয়া যায়, আবার সরিষার ফলনও ভালো হয়।” কম খরচে বহুমুখী লাভ সরিষা চাষে সেচ ও সারের প্রয়োজন তুলনামূলকভাবে কম। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে বপন করা এই ফসল প্রাকৃতিকভাবেই ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। সরিষা গাছের পাতা ঝরে মাটিতে মিশে প্রাকৃতিক জৈব সার তৈরি করে। তেল নিষ্কাশনের পর যে খৈল পাওয়া যায়, তা গবাদিপশুর উৎকৃষ্ট খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া সরিষা কাটার পর একই জমিতে বোরো ধান আবাদ করলে সারের খরচও অনেকাংশে কমে আসে। এসব কারণেই কৃষকদের কাছে সরিষা এখন কম ঝুঁকির অথচ লাভজনক ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কৃষকের চোখে আশার আলো গোদাগাড়ীর কৃষকদের মুখে এখন আশার কথা। নিজেদের ভোজ্যতেলের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে সরিষা ও মধু বিক্রি করে বাড়তি আয় করার স্বপ্ন দেখছেন তারা। সময়মতো বীজ, সার ও কৃষি বিভাগের পরামর্শ পাওয়ায় এবারের ফলন নিয়ে বেশ আশাবাদী কৃষক সমাজ। কৃষি ও প্রকৃতির সহাবস্থান কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সরিষা চাষ শুধু কৃষকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করছে না, বরং দেশের তেলবীজ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভোজ্যতেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকারের যে উদ্যোগ, গোদাগাড়ীর মাঠে ছড়িয়ে থাকা এই হলুদ প্রান্তর তারই নীরব প্রতিফলন।
হলুদের চাদরে মোড়া গোদাগাড়ীর মাঠ তাই কেবল একটি শীতকালীন দৃশ্য নয়—এটি কৃষকের শ্রম, প্রকৃতির সৌন্দর্য আর আগামীর আশার এক জীবন্ত গল্প।
শেয়ার করুন