বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাংলাদেশের নির্বাচনে বড় পর্যবেক্ষক দল পাঠাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দেশটিতে একটি ব্যাপক আকারের নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রোববার (১১ জানুয়ারি) ঢাকায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক বৈঠকে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভারস আইজাবস এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।

বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের এ বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি জানান, আলোচনায় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ, ভোটের পরিবেশ, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের গুরুত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে।

প্রেস সচিব বলেন, ইভারস আইজাবস বৈঠকে উল্লেখ করেছেন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনকে একটি ব্যতিক্রমী ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছে। এ কারণেই তারা এবার বড় পরিসরে নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠায় না; তবে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে এবং বাংলাদেশকে তারা ঘনিষ্ঠ সহযোগী রাষ্ট্র হিসেবে দেখে।

শফিকুল আলম জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা প্রায় সাড়ে ১৬ বছরের শাসনামলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশে কোনো নির্বাচন পর্যবেক্ষক মিশন পাঠায়নি। ইভারস আইজাবসের মতে, ওই সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি সংসদ নির্বাচন আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য ছিল না। তবে বর্তমানে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ইতিবাচক আবহ ও জনমনে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, আলোচনায় আওয়ামী লীগ বা দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়নি। তবে গণভোট প্রসঙ্গে ইভারস আইজাবস বলেন, ‘হ্যাঁ’ ভোট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত ও প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ সুগম হবে।

প্রেস সচিব আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পর্যবেক্ষক দল দেশের সব অঞ্চলজুড়ে কাজ করবে। তারা শুধু বড় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গেই নয়, বরং অন্যান্য অংশীজন, নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় করে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।

প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ইউরোপীয় ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করে বলেন, আসন্ন সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে সম্পূর্ণ অবাধ, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ। তিনি জানান, নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তী সরকার যৌথভাবে নির্বাচন আয়োজনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। তাঁর ভাষায়, দেশজুড়ে এখন নির্বাচনী উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে।

নির্বাচনী নিরাপত্তা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বডি-ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। এসব ক্যামেরা একটি কেন্দ্রীয় অ্যাপের মাধ্যমে উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। পাশাপাশি সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে র‌্যাপিড রেসপন্স স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে প্রস্তুত রাখা হবে।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট চাওয়ার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার আইনগত মতামত গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞরা লিখিতভাবে মত দিয়েছেন যে এ বিষয়ে কোনো আইনগত প্রতিবন্ধকতা নেই। ফলে সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করবে।

প্রধান উপদেষ্টা আরও জানান, আগামী ২২ জানুয়ারি থেকে আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হবে। তাঁর মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তবে অধ্যাপক ইউনূস বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য ও অপপ্রচারের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থকেরা নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালাতে পারে। এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, নারী ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে ভোটগ্রহণ নিয়ে উল্লেখযোগ্য উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ কারণে সরকার আসন্ন নির্বাচনে উচ্চ ভোটার উপস্থিতির ব্যাপারে আশাবাদী।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন।

শেয়ার করুন