বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পথে, হাজারো রোগীর জীবন ঝুঁকিতে

ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধার কারণে ফিলিস্তিনের গাজা অঞ্চলের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্রান্তিকালীন সংকটে পড়েছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর অভাবে হাজারো রোগী মৃত্যুর মুখে, হাসপাতালগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন গাজার শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরাইলের অবরোধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রবেশে বাধা দেওয়ার কারণে গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা নজিরবিহীন বিপর্যয়ের মুখে। গাজার মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ মঙ্গলবার বলেন, “হাসপাতালগুলো এখন করুণ ও ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে। গুরুতর রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারছেন না চিকিৎসকেরা।”

গাজার হাসপাতালগুলোতে জীবনরক্ষাকারী মৌলিক সরঞ্জাম না পৌঁছানোর কারণে চিকিৎসকদের কাজ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত অক্টোবর থেকে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও ইসরাইল নির্ধারিত সংখ্যক চিকিৎসা সহায়তা বহনকারী ট্রাক প্রবেশে বাধা দিচ্ছে। এর ফলে চলমান স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা আরও গভীর হচ্ছে।

আল-বারশ জানান, ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রায় তিন-চতুর্থাংশই অনুপস্থিত। এছাড়া স্যালাইন, গজ, অবশ করার ওষুধ এবং ডায়ালাইসিস সামগ্রীর সংকট প্রকট। বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জেনারেটরের ঘাটতিও চিকিৎসা কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ গঠনের পর ৩০ বছরের মধ্যে এটি সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট।”

ইসরাইলের দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা আগ্রাসনে গাজার প্রায় সব হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ১২৫টি স্বাস্থ্য স্থাপনা হামলার শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৩৪টি হাসপাতাল। এ সময়ে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন এবং ৯৫ জন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হাতে আটক রয়েছেন, যার মধ্যে ৮০ জনই গাজার।

আল-বারশ বলেন, শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত রোগীরাই নয়, সাধারণ রোগীরাও চিকিৎসার অভাবে ভুগছেন। গাজার চার হাজার গ্লকোমা রোগী স্থায়ী অন্ধত্বের ঝুঁকিতে রয়েছেন। এছাড়া প্রায় ৪০ হাজার বাস্তুচ্যুত অন্তঃসত্ত্বা নারী অস্বাস্থ্যকর আশ্রয়ে বসবাস করছেন, যা তাদের এবং জন্ম নেয়ার শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।

মানবিক সহায়তা সীমিত থাকায় পাঁচ বছরের কম বয়সি প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। গাজার বাইরে চিকিৎসার জন্য যারা পাঠানো হয়, সেখানে দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে অনেক রোগী প্রাণ হারাচ্ছেন। আল-বারশ জানান, চিকিৎসার অনুমতির অপেক্ষায় অন্তত ১ হাজার ১৫৬ রোগী মারা গেছেন। প্রক্রিয়াটি জটিল, যেখানে রোগীদের তালিকা প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) যাচাই করে, তারপর ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তা অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।

বর্তমানে গাজার প্রায় ২০ হাজার রোগী বিদেশে চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে ১৮ হাজার ৫০০ জনকে ডব্লিউএইচও অনুমোদন দিয়েছে, আর প্রায় ৩ হাজার ৭০০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। অপেক্ষমাণ রোগীর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৩০০ শিশু রয়েছেন।

আল-বারশ অবিলম্বে সীমান্ত ক্রসিং খোলার মাধ্যমে মানবিক সহায়তা প্রবেশের সুযোগ এবং গুরুতর রোগীদের বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, “আরও দেরি হলে বহু প্রাণ হারাতে পারে।”

শেয়ার করুন