চলতি বছরের ৫ এপ্রিল, লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা আল-আমিন ফ্রি ভিসায় সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কাজের সুযোগ দেয়ার প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও গত তিন মাসে তিনি কোনো স্থায়ী চাকরি পাননি। সৌদি কোম্পানি ও বিভিন্ন বাংলাদেশি নিয়োগদাতার কাছে যাতায়াত করেও কাঙ্ক্ষিত কাজের সুযোগ মেলেনি। এই সমস্যার পেছনে তিনি আরবি ভাষা না জানা এবং প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবকে দায়ী করছেন।
৫ ডিসেম্বর জাগো নিউজের সঙ্গে আল-আমিন বলেন, “আমি দেশে রাজমিস্ত্রি ও অ্যালুমিনিয়ামের কাজসহ বিভিন্ন কারখানায় কাজ করেছি। তবে এখানে ভাষার অভাবে নিজ ক্ষমতা প্রকাশ করতে পারি না। একবার প্রতিবেশীর সঙ্গে একটি কারখানায় গিয়েও একদিন কাজ করার পর আমাকে বাদ দিয়ে দেন। ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ধরনের অবহেলার সম্মুখীন হতে হয়েছে।”
শুধু আল-আমিন নয়, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিকও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আরবি ভাষা না বোঝার ফলে তারা চাকরির সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং প্রবাস জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। সরকারি উদ্যোগও এ বিষয়ে অপর্যাপ্ত।
চলতি বছরের মার্চে কাজের উদ্দেশ্যে কাতারে যাওয়া নোয়াখালীর বাসিন্দা ইয়াসির হামিদ জাগো নিউজকে বলেন, “আত্মীয়ের মাধ্যমে ভিসা পেয়েছিলাম, দোকানে কাজের ব্যবস্থা করা হবে বলেছিলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজের ব্যবস্থা হয়নি। নতুন হওয়ায় আরবি ভাষায় দক্ষতা না থাকায় নিজের কাজ নিজে খুঁজতে হচ্ছে। পরিচিত বাংলাদেশিদের সাহায্য নিয়েও কাজ পাইনি। এসএসসি পাস হলেও দেশে থাকতে ভাষার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি। কার্পেটের দোকানে কাজের সুযোগ ছিল, কিন্তু কাস্টমারের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যর্থ হয়ে একমাসও কাজ করতে পারিনি। মাঝে মাঝে কন্সট্রাকশনের কাজে নিই, তবে খরচ চালাতে কষ্ট হয়।”
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক যান। সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত এই অঞ্চলের প্রধান লক্ষ্যবস্তু। এই দেশগুলোর সরকারি ভাষা আরবি হওয়ায় ন্যূনতম ভাষাগত দক্ষতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বাস্তবে প্রায় ৯৫ শতাংশ বাংলাদেশি শ্রমিক দেশগুলোতে যাওয়ার আগে আরবি শিখে যান না। ভাষা শেখায় আগ্রহও কম থাকে এবং সরকারের উদ্যোগও পর্যাপ্ত নয়।
ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমিকরা বিদেশে কাজের সুযোগ হারান। স্থানীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যর্থ হলে তারা কম বেতনের ‘অড জব’ করতে বাধ্য হন। এতে ব্যক্তিগত আয়ের ক্ষতি হয় এবং দেশের রেমিট্যান্সও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন কর্মরত শ্রমিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এক বছরের মধ্যে ন্যূনতম আরবি ভাষা বোঝা শুরু হয়। তবে প্রথম ছয় মাস দালাল ও ভাষাগত সমস্যা সামলাতে শ্রমিকদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। সৌদি আরবের বিখ্যাত পান্ডা কোম্পানিতে ছয় বছর ধরে কর্মরত তৌহিদুর রহমান বলেন, “নির্দিষ্ট কোম্পানির মাধ্যমে আসা শ্রমিকরা ভাষা নিয়ে সমস্যায় পড়েন না। কিন্তু অধিকাংশ শ্রমিক দালাল ও সাপ্লাই কোম্পানির খপ্পরে পড়ে প্রতিশ্রুত কাজ না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন। তিন মাসের ভিসায় আসে, কাজ বা ইকামা না পেলে শুরুতে শ্রমিকরা ভালো চাকরি ও বেতন পান না।”
সৌদির জেদ্দায় থাকা আলমগীর হোসেন বলেন, “দালালরা শ্রমিকদের শুধু নিয়ে আসে, কোনো খোঁজ-খবর রাখে না। প্রথমে রাস্তায় বের হলে পুলিশে ধরা পড়ার ঝুঁকি থাকে। আরবি বা ইংরেজি জানি না। দেশে যদি ভাষা শেখার ব্যবস্থা থাকত এবং দালালদের প্রতারণা কমত, তাহলে ভালো চাকরি পেতাম।”
বাংলাদেশে ১১০টি টিটিসি সেন্টারের মধ্যে কোথাও আরবি ভাষার প্রশিক্ষণ নেই। বিএমইটির ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে বিভিন্ন ভাষার উদ্যোগ থাকলেও আরবি শিক্ষক বা আধুনিক শিক্ষণব্যবস্থা নেই। নোয়াখালী জেলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ ওয়ালিউল্লাহ মোল্লা বলেন, “আমাদের কেন্দ্রের তিনদিনের প্রি-ডিপার্চার ওরিয়েন্টেশন কোর্সে একটি ছোট আরবি বই দেওয়া হয়, যা ন্যূনতম যোগাযোগের জন্য। তবে কার্যকরভাবে আরবি শেখানোর উদ্যোগ নেই।”
বিএমইটিএর অধীনে ২৬টি টিটিসিতে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ দপ্তরের পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহউদ্দীন বলেন, “কর্মীদেরকে ন্যূনতম কথা বলার মতো আরবি শেখানো হবে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। তবে শ্রমিকদের আগ্রহ থাকা জরুরি।”
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, “সরকার চাইলে আরবি ভাষা শেখাকে বাধ্যতামূলক করতে পারে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের আরবি ভাষার সার্টিফিকেট থাকা উচিত। এটি অভিবাসন ব্যবস্থাকে টেকসই রাখতে সাহায্য করবে। আরবি শিক্ষার জন্য বিদেশি শিক্ষক নিয়োগ বা দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা অভিজ্ঞদের প্রশিক্ষক হিসেবে নেওয়া যেতে পারে।”





