প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দালাল ও প্রতারণামুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, “বিদেশগমন আজ বিপজ্জনকভাবে দালাল ও প্রতারণার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থা থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত অর্থবহ অগ্রগতি হয়েছে— এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই।”
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন অধ্যাপক ইউনূস।
তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক দালালচক্র, নথি জালিয়াতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে গভীর ও জটিল সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য দালাল ও প্রতারণামুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর তিনি জোর দেন।
প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, সরকারের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও প্রবাসী কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত হয়নি। তিনি বলেন, “অনেক উদ্যোগ বাইরে থেকে বেশ আকর্ষণীয় ও গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও সরকার এখনো দালাল নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মূল কাঠামোর ভেতরে ঢুকতে পারেনি।”
গ্রামীণ ব্যাংকের অভিজ্ঞতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “গ্রামাঞ্চলের নারীরা সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে ঋণের জন্য আবেদন জানালে প্রথম দালালচক্রের বাস্তব চিত্র সামনে আসে।”
বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের অভিবাসন ক্ষেত্র প্রায় দালালনিয়ন্ত্রিত, বলেন তিনি। “কে কার কাছ থেকে কী কারণে টাকা নিয়েছে— তা বোঝা প্রায় অসম্ভব। সরকার এখনো এই ব্যবস্থার অনেক বাইরে অবস্থান করছে। রেমিট্যান্স আয়ের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নিতে হলে যেকোনও মূল্যে এই বাস্তবতা বদলাতে হবে।”
অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়া।
এছাড়া অনুষ্ঠানে তিনটি ক্যাটাগরিতে মোট ৮৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশিকে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (সিআইপি) হিসেবে সম্মাননা দেওয়া হয়। এর মধ্যে শিল্প খাতে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের জন্য একজন, বৈধ পথে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য ৭৫ জন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি পণ্য আমদানির জন্য ১০ জন রয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা থেকে ক্রেস্ট গ্রহণ করেন যথাক্রমে কল্লোল আহমেদ, মো. আবদুল করিম ও মো. মাহমুদুর রহমান খান।
অনুষ্ঠানে প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিমা সুবিধা, চিকিৎসা সহায়তা, আর্থিক অনুদান, ক্ষতিপূরণ এবং মেধাবী সন্তানদের জন্য বৃত্তির চেক বিতরণ করা হয়। প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন, যেমন ক্রোয়েশিয়ার প্রবাসী রাজু আহমেদ ও সৌদি ফেরত শাহনাজ আক্তার শানু।
উদ্বোধনী প্রামাণ্যচিত্রে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকা এবং দেশের অর্থনীতিতে তাদের অবদান তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল মন্ত্রণালয়ের সংস্কার ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাদের সরকার বিদেশে আটক বাংলাদেশি অভিবাসীদের মুক্ত করতে উদ্যোগ নিয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতি সংহতি জানিয়ে বিভিন্ন দেশে কারাবন্দি ছিলেন। আমরা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কাছে আবেদন করেছি। বলেছি, তারা কোনও অপরাধী নয়। তারা আবেগের বশে আইন লঙ্ঘন করেছে, বিদ্বেষ থেকে নয়।”
তিনি আরও বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা যে দেশগুলোতে থাকেন, সেসব দেশের আইন ও শাস্তি জানলেও প্রিয় দেশের জন্য কিছু করার তাগিদে আইন উপেক্ষা করেছেন।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ স্মরণ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, “গত বছর তার বাংলাদেশ সফরের সময় হাজারো বাংলাদেশি কর্মীর সমস্যার সমাধান হয়েছে। পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করেও তারা দেশটিতে যেতে পারছিলেন না।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশের তরুণরা বিশ্ব মানবসম্পদের চাহিদা পূরণে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। দক্ষতা, ভাষা শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে দালাল ও জালিয়াতিমুক্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। “মূল সমস্যা অর্থ নয়, সমস্যা হলো ব্যবস্থা। এটি শৃঙ্খলা ও সুশাসনের প্রশ্ন। এই সোনার খনি ব্যবহার করতে না পারলে ভাগ্য কখনো বদলাবে না।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বিদেশে পাঠানো প্রত্যেক কর্মী দেশকে সঙ্গে নিয়ে যায়, পেছনে ফেলে যায় না। দেশকে এগিয়ে নিতে এবং প্রবাসী তরুণদের সঠিক সুযোগ দিতে সুশৃঙ্খল ও দালালমুক্ত ব্যবস্থা অপরিহার্য।





