বাংলার চোখ নিউজ :
প্রিন্সিপাল সাব্বির উদ্দিন আহমেদ
আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদীর ছবলে মারাত্বকভাবে ক্ষতবিক্ষত গোটা বিশ্ব। গতকাল ভোরে আমেরিকা তার স্পেশাল ফোর্স ডেল্টা অতর্কিত হামলা করে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রীকে অপহ্রত করে নিয়ে যায়। আজ তাকে খুবই অমানবিকভাবে হাতকড়া অবস্থায় নিইউর্য়কে হাটিয়ে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এটা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গিয়ে হাতকড়া অবস্থায় হাটিয়ে নিয়ে যাওয়াটা কতটা অর্মযাদাকর ও অবমাননাকর তা বলে শেষ করা যায় না। আমেরিকা যে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী রাষ্ট্র তা ভেনিজুয়েলায় তার নগ্ন আগ্রাসন ও সেই দেশের প্রেসিডেন্টর সাথে চোরের মতো অপমানকর, অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ বিশ্ববাসী দেখে রীতিমতো হতবাক, বিস্মিত ও শংকিত।
বিশ্বে কোনো দেশের কারোরই কোনো নিরাপত্তা নেই, সে যত ক্ষমতাশীল হোক না কেন সে যদি আমেরিকা ও তার দোসরদের চক্ষুশূল হয়, তার যে নিস্তার বা মুক্তি নেই তা ভেনিজুয়েলায় আমেরিকার কাপুরুষোচিত হামলা ও আগ্রাসন থেকে বিশ্ববাসীর বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
ইতিপূর্বে আমেরিকা একইভাবে পানামার শাসক জেনারেল নরিয়েগাকে ধরে নিয়ে একটি নির্জন দ্বীপপুঞ্জে বন্দী করে রেখেছিল। তারপর সাদ্দাম হোসেনকে ছুতানাতা দিয়ে আটক করে পরে ফাসীতে ঝুলিয়ে হত্যা করে। আর লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফীকে ও পরাশক্তির নির্দেশেই হত্যা করা হয়।
আমেরিকা, ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্র ও পশ্চিমা শক্তি গোটা বিশ্বে লুটেপুটে খাচ্ছে। তার-ই প্রকৃষ্ট ও সর্বশেষ উদাহরণ হচ্ছে ভেনিজুয়েলা ও তার আমেরিকা বিরোধী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও স্ত্রীকে আটক করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া এবং তার বিপুল পরিমাণ তেল সম্পদ কুক্ষিগত করার গভীর ষড়যন্ত্র। পানামার নরিয়েগা, ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফী এবং চলমান ফিলিস্তিনে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ এই সব কিছুই আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনের ভয়াবহতার বহি:প্রকাশ।
আমাদের কথা হলো যে, আমেরিকা ও মিত্ররা কেন জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাংগলি দেখিয়ে তাদের খেয়ালখুশি মতো যেকোনো নিরীহ দেশ ও মানুষের উপর সন্ত্রাস ও মাদকের অপবাদ দিয়ে সে দেশে উলংগভাবে সাড়াশি আক্রমণ করে দখল করা এবং সেখানকার খনিজ সম্পদ লুট করে নিয়ে যাওয়াটা বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সম্পূর্ণভাবে অন্তরায়।
এটা কেমন সভ্যতা ও ভদ্রতা যে আপনি চাইলেই একটা দেশের রাষ্ট্র প্রধানকে কিডন্যাপ করে হাতকড়া পরিয়ে হেটে নিয়ে যাবেন। এটা কোনো শিষ্টাচারের ভিতরে কি পড়ে তা নতুন করে বিশ্ববাসীর নিকট প্রশ্ন উদ্রেক হয়েছে। এই আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তি যারা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ফেরিওয়ালা তাদের দ্বারা এহেন সন্ত্রাসী ও শিষ্টাচার বহির্ভূত কার্যক্রম তা কি কোনোক্রমে তাদের দাবির সাথে যায়? তাদের তৃতীয়বিশ্বের দেশগুলোকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার সবক প্রদান আবার নিজেদের ব্যাপারে আসলে তা কোনো তোয়াক্কা না করা কিংবা থোড়াই কেয়ার না করা এটা কিসের আইন ও নীতি? বিশ্ববাসীর কাছে বারংবার এই প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে।
আমরা বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার কথা বলি, কিন্তু তা কিভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব যদি যারা মড়োল তারাই কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে?
সুতরাং আজ আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদ তথা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জোরেশোরে কথা উঠছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ তথা আধিপত্যবাদ গোটা বিশ্বকে কোনঠাসা করে রেখেছে। উপরে এই সাম্রাজ্যবাদ দেখতে খুবই ফিটফাট ও নিয়ম-নৈতিকতায় পরিপূর্ণ, কিন্তু ভিতরে কদাকারে ভরপুর। ভিতরে কোনো নিয়ম-নীতির বালাই নেই। তাদের মতো কুৎসিত ও বর্বর আর কে হতে পারে? তারা সবচেয়ে বর্বর ও সবচেয়ে নিষ্ঠুর জাতি যাদের মাঝে মানবতা ও মনুষত্ববোধের ছিটেফোঁটা ও নেই। তারা সবচেয়ে বড় লুটেরা ও দস্যু। তারা শুধুমাত্র জানে কিভাবে অন্যের সম্পদ খোড়া অজুহাতে লুন্ঠন করে নেয়া যায়।
গত দুই বছর ধরে ইসরাইল নামক ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনে গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাকে রুখার মতো বিশ্বে আর কেউ কি আছে? না, মোটেই না। কেননা আমেরিকা ও তার মিত্রদের ইসরাইল নামক ক্ষুদ্র ইহুদি রাষ্ট্রকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইল রেকর্ড ছাপিয়ে পৈশাচিক গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
আজ বিশ্ব এই সাম্রাজ্যবাদের কব্জায় পুরোপুরি বন্দী। মুক্তির বারতা কে দিবে? কে শুনাবে আমাদের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বকে নাড়িয়ে দেয়ার গান ‘বল বীর বল উন্নত মম শির/ শির নেহারি আমারি নত শির/ঐ শিখর হিমাদ্রি’।
আজ কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্ববিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’র ১০৪ তম জন্মবার্ষিকী। কবিতাটির লেখার প্রেক্ষাপট ব্রিটিশ উপনিবেশিকতা, সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদকে উৎখাতের ডাক দেয়া হয়েছিল এবং উপমহাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে জনগণকে সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে সবাইকে ঝাপিয়ে পড়ার জন্যে উদাত্ত আহবান করা হয়েছিল এই কালজয়ী এবং বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী কবিতা ‘বিদ্রোহী’র মাধ্যমে।
আজকেও এই বিশ্ববিখ্যাত কবিতাটির আবেদন প্রাসংগিক। শহীদ হাদী এই কবিতার স্বার্থক ধারক ও সোচ্চার কন্ঠস্বর ছিলেন। তিনি তার শাহাদাতের আগ পর্যন্ত আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই অব্যাহত রেখেছিলেন।
ঐতিহাসিক জুলাই বিপ্লব এবং দেশে দেশে আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদীদের আগ্রাসন বিশেষ করে আমেরিকার হঠকারী ও অহেতুক ভেনিজুয়েলায় চলতি আগ্রাসন এই কবিতার বিশ্বজনীনতাকে বিশ্বব্যাপী নিপিড়িত, মুক্তিকামী ও সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যবাদ বিরোধী আন্দোলনগুলোকে অনুপ্রাণিত করছে এবং ভবিষ্যতে করবে। আমরা ভেনিজুয়েলায় অবৈধ আমেরিকার আগ্রাসনকে তীব্র নিন্দা জানাই। আমরা সকল সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে জোরেশোরে আওয়াজ তুলি এবং তাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই।
শিক্ষাবিদ, গবেষক, লেখক ও সিনিয়র সাংবাদিক





