নবজাতকের কান্না এবং হাসি মানব জীবনের প্রথম অনুভূতির সূচনা। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে শিশু প্রথমে কেঁদে ওঠে, যা ভাসমান মনে হলেও এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। নতুন পৃথিবীতে শিশুর প্রথম অভিব্যক্তি হিসেবে কান্না দেখা যায়, আর হাসি সাধারণত কিছু সপ্তাহ পর থেকে শুরু হয়। এই প্রাথমিক অভিব্যক্তি চিকিৎসক ও পরিবারের কাছে সুখবরও বয়ে আনে।
শিশু জন্মের পর প্রথম কান্না হয় মূলত তার শ্বাসপ্রশ্বাস শুরু করার জন্য। গর্ভে অবস্থানের সময় শিশুর ফুসফুস ‘অ্যামনিয়োটিক ফ্লুইড’ দ্বারা ভর্তি থাকে। এই তরল শিশুদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশে সহায়তা করে, পুষ্টি সরবরাহ করে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। জন্মের পর ফুসফুস পুনর্গঠিত হতে থাকে, এবং প্রথম কান্নার মাধ্যমে ফুসফুসের এই তরল বের হয়। একই সঙ্গে বাইরের অক্সিজেনসমৃদ্ধ বাতাস ফুসফুসে প্রবেশ করে, বায়ু থলিগুলো প্রসারিত হয় এবং সামান্য অস্বস্তি অনুভব হওয়ায় শিশুটি কাঁদে।
কান্না শিশুর শরীরে রক্ত সঞ্চালন ও হৃৎস্পন্দনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতেও সহায়ক। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে কান্নার মাধ্যমে পুরো শরীরে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। এছাড়া, কান্না শিশুর পাচনতন্ত্রকে সক্রিয় করে, যা তাকে মাতৃদুগ্ধ পান করার জন্য প্রস্তুত করে।
শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশও কান্নার পেছনের গুরুত্বপূর্ণ কারণ। নবজাতকের আবেগ কান্না ও হাসি প্রাথমিকভাবে মস্তিষ্কের নিচের অংশ, বিশেষত ব্রেনস্টেম এবং অ্যামিগডালা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। জন্মের পর এই অংশগুলো বিকশিত হওয়ার কারণে শিশুর প্রথম অভিব্যক্তি হিসেবে কান্না দেখা দেয়। হাসি বা সামাজিক প্রতিক্রিয়ার মতো জটিল আবেগের নিয়ন্ত্রণের জন্য মস্তিষ্কের উপরের অংশ, সেরিব্রাল কর্টেক্স প্রয়োজন, যা পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে সময় নেয়। সাধারণত শিশুর প্রথম হাসি জন্মের ৬–৮ সপ্তাহ পর প্রকাশ পায়।
হাসির ধরনও দুইভাবে দেখা যায় ‘রিফ্লেক্স স্মাইল’, যা শিশুর ঘুমের মধ্যে পেশির সংকোচন ও প্রসারণের কারণে হয়, এবং ‘সোশ্যাল স্মাইল’, যা শিশুর মানুষ চিনতে পারার এবং প্রতিক্রিয়া প্রদর্শনের ফলে আসে। হাসি প্রকাশে মুখের পেশি ও মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যা পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়।
চিকিৎসকরা সতর্ক করেন, জন্মের পর শিশুর কাঁদা না হলে তা গম্ভীর সতর্কতার বিষয়। এটি হতে পারে ‘পেরিনাটাল অ্যাসফিক্সিয়া’-র লক্ষণ, যেখানে শিশুর মস্তিষ্ক ও ফুসফুসে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি এবং প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে। দ্রুত চিকিৎসা না পেলে ‘হাইপক্সিক-ইস্কেমিক এনসেফেলোপ্যাথি’ হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক সমস্যা তৈরি করতে পারে। এছাড়া সেরিব্রাল পলসি, মৃগী, বধিরতা, অন্ধত্ব এবং ভাষাগত সমস্যা সহ জটিল স্নায়বিক রোগের সম্ভাবনা থাকে।
সাধারণভাবে বলা যায়, নবজাতকের কান্না এবং পরে হাসি এগুলো শুধু আবেগের প্রকাশ নয়, বরং শারীরিক ও স্নায়বিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এটি শিশুর সুস্থতা ও স্বাভাবিক বিকাশের প্রতিফলন।





