জলিলুর রহমান, সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি :
“আমরা বিক্রি করি পরিশ্রম, শরীর নয়”— এই এক কথায় যেন ধরা পড়ে শত শত শ্রমিকের জীবনের গল্প। সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের নাটুয়ারপাড়া হাটে প্রতি সপ্তাহে দু’দিন বসে এক ব্যতিক্রমী হাট—যার নাম মানুষের হাট। এখানে মানুষ বিক্রি হয় না দাস হিসেবে, বরং টিকে থাকার আশায় বিক্রি হয় তাদের ঘাম ও পরিশ্রম।
প্রতি শনিবার ও বুধবার কাক ডাকা ভোরেই কাজিপুর নাটুয়ারপাড়া বাজারে শুরু হয় এই হাটের আনাগোনা। শত শত শ্রমিক আসে কাজের খোঁজে। কারও হাতে কোদাল, কারও কাঁধে বেলচা—সবাই অপেক্ষায় থাকে, যদি কোনো মালিক এসে ডাকে, যদি আজকের দিনে একটা কাজ মেলে।
তাদের চোখে একটাই আশা—আজ যেন কিছু আয় হয়, যাতে সন্তানের মুখে একবেলা ভাত তুলে দিতে পারেন।
সদর উপজেলা জেলার শ্রমিক আবু হোসেন (৫০) জানান, “পরিবারের অবস্থা ভালো না থাকায় লেখাপড়া করতে পারিনি। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে প্রতিমাসেই এখানে আসি। কখনো ৫০০, কখনো ৭০০ টাকায় দিন বিক্রি হয়। কিন্তু অনেক সময় কোনো কাজ পাই না। যেদিন কাজ পাই না, সেদিন পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়।”
এই হাটে শ্রম বিক্রি হয় দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। তবে অনেকে কাজ না পেয়েই খালি হাতে ফিরে যান। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে হাটে মালিকেরা ঘুরে ঘুরে শ্রমিক বেছে নিচ্ছেন। কেউ হাতের জোরে, কেউ অভিজ্ঞতায় দর বাড়িয়ে নিচ্ছেন। কারও দাম ওঠে ৪০০, কারও ৬০০, আবার কেউ কাজ না পেয়েই দাঁড়িয়ে থাকেন দিনের পর দিন।
এখানে দর নির্ধারণ হয় যেন জীবনের প্রয়োজন অনুযায়ী, মানবিকতার নয়। কাজিপুর নাটুয়ারপাড়া হাট বাজার ইজারাদার ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আব্দুল লতিফ সরকার জানান, “বহু বছর ধরে এই হাটে মানুষ বেচাকেনার মতো শ্রমবাজার বসে। এখানকার বেশিরভাগ মানুষ চরাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের। তারা প্রতিদিনের শ্রম বিক্রি করেই বাঁচে।”
এই হাটের মানুষের নেই কোনো স্থায়ী মালিক, নেই নিশ্চয়তা। আছে শুধু অনিশ্চিত জীবনের একটানা সংগ্রাম। তবুও তারা হাল ছাড়েন না। প্রতিদিন ভোরে ঘুম ভাঙে একটাই ভাবনায়—আজকের দিনে কিছু টাকা আয় হবে কিনা।
দারিদ্র্য, ক্ষুধা আর অপ্রাপ্তির মাঝেও তারা জীবনকে বাঁচিয়ে রাখেন নিজেদের ঘামের জোরে কাজিপুর নাটুয়ারপাড়ার এই “মানুষের হাট” আধুনিক সমাজের এক নীরব প্রতিচ্ছবি—যেখানে এখনো মানুষ বিক্রি হয়, কিন্তু দাস হিসেবে নয়। বিক্রি হয় বেঁচে থাকার লড়াই, পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায়।





