বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

‘গুগল জিরো’ যুগের শুরু, ছোট ওয়েবসাইটগুলোর অস্তিত্ব সংকটে

কয়েক মাস আগ পর্যন্ত গুগলে কোনো বিষয় সার্চ করলে ব্যবহারকারীরা একের পর এক লিঙ্কে গিয়ে বিস্তারিত পড়ার সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমানে সেই চিত্র পরিবর্তিত হয়েছে। সার্চ করলে শীর্ষে সরাসরি ‘এআই ওভারভিউ’ প্রদর্শিত হচ্ছে। অর্থাৎ, গুগল নিজের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সার্চ কোয়েরির উপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংক্ষিপ্ত সারাংশ তৈরি করছে। এই সুবিধা ব্যবহারকারীর জন্য সহায়ক হলেও, তৈরি হয়েছে নতুন এক চ্যালেঞ্জ, যা ‘গুগল জিরো’ নামে পরিচিত।

গুগলের এআই ওভারভিউ ব্যবহারকারীকে সার্চের শুরুর মুহূর্তে সরাসরি উত্তর দেয়। ওয়েবসাইট থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ তৈরি হয়। যদিও কিছু লিঙ্ক দেখানো হয়, ব্যবহারকারীর বড় অংশ আর সেগুলোতে ক্লিক করছে না। এর ফলে তৃতীয় পক্ষের ওয়েবসাইটগুলোতে ট্রাফিক ও বিজ্ঞাপন থেকে আয় দুটোই কমছে।

২০২৪ সালে ‘দ্য ভার্জ’-এর প্রধান সম্পাদক নিলয় প্যাটেল প্রথম ‘গুগল জিরো’ ধারণাটি প্রকাশ করেন। তার মতে, যখন গুগল বাইরের ওয়েবসাইটে ট্রাফিক পাঠানো বন্ধ করবে, তখনই শুরু হবে ‘জিরো ক্লিক যুগ’। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেই যুগ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

দীর্ঘদিন ধরে ইন্টারনেটে মানুষ গুগলের ওপর নির্ভরশীল। সার্চ, ব্রাউজ, বিজ্ঞাপন—সবই গুগলের প্ল্যাটফর্মে। তবে এআই ওভারভিউ এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে, যারা এআই সামারি দেখেন, তাদের মধ্যে মাত্র ৮% রেজাল্টের লিঙ্কে ক্লিক করেন। অন্যদিকে, যারা সামারি ব্যবহার করেন না, তাদের ক্লিক রেট প্রায় দ্বিগুণ। এছাড়া, এআই সামারিতে উল্লেখিত সোর্স লিঙ্কে ক্লিক হয় মাত্র ১% ক্ষেত্রে।

নিলয় প্যাটেল বলেন, “যদি গুগল সিদ্ধান্ত নেবে থার্ড-পার্টি ওয়েবসাইটে ট্রাফিক পাঠানো বন্ধ করবে, তখন ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতার জন্য তার কোনো আইনি বা কারিগরি বাধা নেই। কারণ, এআই সামারি ইতোমধ্যেই প্রথম উত্তর হয়ে গেছে।”

ছোট ওয়েবসাইটগুলো সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হচ্ছে। হাউসফ্রেশের মতো সাইট জানিয়েছে, ‘গুগল আমাদের মতো ছোট ওয়েবসাইটের অস্তিত্বই সংকটে ফেলেছে’। নিউজ সাইট, ব্লগ, রিভিউ ও গবেষণাভিত্তিক ওয়েবসাইটও ট্রাফিক হ্রাসের মুখোমুখি। ই-কমার্স ও অ্যাফিলিয়েট প্ল্যাটফর্মগুলোকেও প্রভাবিত করছে।

বিশেষায়িত জ্ঞানভিত্তিক কনটেন্ট বা স্বতন্ত্র পরিচিতি সম্পন্ন ব্র্যান্ডগুলোর জন্য ঝুঁকি কম। ভিডিও-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম যেমন ইউটিউব বা শর্ট ভিডিওগুলোর ক্ষেত্রে এআই সামারি প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম।

গুগল দাবি করছে, এআই ওভারভিউ ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নত করছে। তবে মিডিয়া রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, অনেক ওয়েবসাইটের ভিজিটর সংখ্যা অর্ধেকেরও কমে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওয়েব আরও বেশি কেন্দ্রায়িত হয়ে এককেন্দ্রিক হয়ে পড়বে। পেইড সাবস্ক্রিপশন, মেম্বারশিপ, নন-অ্যাড রেভিনিউ, বিশেষায়িত কনটেন্ট বা পডকাস্টের মতো বিকল্প আয়মুখী মডেল তৈরির প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। বিজ্ঞাপন-নির্ভর প্রকাশক, ব্লগ এবং রিভিউ সাইটগুলোর আয় কমতে থাকবে। অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং ও ই-কমার্সে গুগল ভেতরের প্রতিযোগিতা বাড়ার ফলে খরচও বাড়বে।

সারসংক্ষেপে বলা যায়, গুগলের এআই ওভারভিউ ওয়েব দুনিয়ার স্থিতিশীলতা বদলে দিচ্ছে। এটি ব্যবহারকারীর সুবিধা নিয়ে আসলেও, প্রকাশক, ছোট ওয়েবসাইট ও ই-কমার্সের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

শেয়ার করুন