অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বা আল্ট্রা-প্রসেসড ফুডসের (ইউপিএফ) সঙ্গে ফলমূল বা শাকসবজির চেয়ে সিগারেটের মিল বেশি আছে। ইউপিএফ তৈরির প্রক্রিয়া, ব্যবহৃত উপাদান ও সংরক্ষণের কৌশলের কারণে খাদ্যদ্রব্যগুলো দ্রত হজম হয় এবং পেটে যাওয়ার পরই মস্তিস্ককে অস্বাভাবিক করে তোলে। এ কারণে এই খাবারের প্রতি আসক্তিও তৈরি হয় বলে এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে
প্রতিবেদনটি দ্য মিলব্যাংক নামে একটি ত্রৈমাসিক জার্নালে সম্প্রতি প্রকাশ হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোকে সাধারণ খাবারের পরিবর্তে সিগারেটের মতো বিবেচনা করা এবং সেই অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। গবেষকরা দেখেছেন যে, ইউপিএফ কেবল ভুলবশত অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠেনি, বরং এগুলোকে অত্যন্ত কৌশলে আসক্তি তৈরি করার মতো পণ্য হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
গবেষণায় আরো প্রকাশ পেয়েছে যে, খাদ্য শিল্প বর্তমানে সেই একই কৌশল ব্যবহার করছে, যা তামাক শিল্প কয়েক দশক আগে ব্যবহার করেছিল। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোম্পানিগুলো উন্নত বিজ্ঞান ব্যবহার করে এমন সব পণ্য তৈরি করছে, যা শরীরের স্বাভাবিক ‘পেট ভরে গেছে’ সংকেতকে এড়িয়ে যায়, ফলে মানুষের পক্ষে এগুলো খাওয়া বন্ধ করা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, খাদ্য শিল্প চর্বি, চিনি, লবণ এবং ফ্লেভার মিশ্রনের এমন সুনির্দিষ্ট হার ব্যবহার করে, যা মস্তিষ্কে প্রকৃতির যেকোনো কিছুর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী তৃপ্তি তৈরি করে। এছাড়া অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে শরীর এগুলো অত্যন্ত দ্রুত হজম ও শোষণ করতে পারে। একই সঙ্গে ব্লাড সুগার ও ডোপামিন বা বার্তা আদানপ্রদানকারী হরমোন দ্রুত বাড়ায়, যে কাজ মূলত নিকোটিন করে থাকে। এটি আসক্তির অন্যতম প্রধান কারণ।
গবেষকরা এই কৃত্রিম খাবারের উত্থানের সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সার এবং স্নায়বিক ব্যাধিসহ বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে ধারণা
ইউপিএফ হলো সেইসব পণ্য যা উল্লেখযোগ্য শিল্প প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় এবং এতে সাধারণত এমন সব উপাদান থাকে যা একাধিক উপায়ে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এগুলোতে মাঝে মধ্যেই সুইটনার, প্রিজারভেটিভস, ফ্লেভার এনহ্যান্সার এবং ইমালসিফায়ারের মতো উপাদান থাকে, যা খাবারগুলোকে সুবিধাজনক এবং আকর্ষণীয় করে তুললেও স্বাস্থ্যকর করে না। চিনিযুক্ত পানীয়, প্যাকেটজাত খাবার, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও স্যুপ, প্রক্রিয়াজাত মাংস, ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, হিমায়িত খাবার এবং সস ও বিশেষ কিছু সালাদ হলো অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের সাধারণ উদাহরণ।
এগুলো স্বাস্থ্যের ওপর কীভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে?
পুষ্টির অভাব: অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারে প্রায়ই প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের অভাব থাকে এবং এগুলো উচ্চ ক্যালরিযুক্ত হয়, যা শরীরে পুষ্টির ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে।
স্থূলতা এবং বিপাকীয় ব্যাধি: খাবারগুলোতে প্রচুর পরিমাণে চিনি এবং অস্বাস্থ্যকর চর্বি থাকে, যা স্থূলতা এবং মেটাবলিক ডিসঅর্ডারের কারণ হয়। এর সহজলভ্যতা এবং মুখরোচক স্বাদের কারণে মানুষ প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খেয়ে ফেলে।
দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি: গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়া হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এতে থাকা মিশ্রন এবং প্রিজারভেটিভস শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া ও অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্য আসক্তি: অনেক অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার এমনভাবে তৈরি করা হয় যাতে এগুলো অতিরিক্ত সুস্বাদু হয়। এ কারণে এই খাবারের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং আসক্তির মতো আচরণ তৈরি হতে পারে, যা নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা কঠিন করে তোলে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব: এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কিছু গবেষণায় অতিরিক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার খাওয়ার সঙ্গে বিষণ্নতা এবং উদ্বেগের মতো মানসিক ব্যাধির যোগসূত্র পাওয়া গেছে।
খাদ্যাভ্যাস থেকে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বাদ দেওয়ার এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার উপায়
বাড়িতে তৈরি খাবারে প্রাধান্য: বাড়িতে খাবার তৈরি করলে এর উপকরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য, চর্বিহীন প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির মতো প্রাকৃতিক ও ন্যূনতম প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
লেবেল পড়া: প্যাকেটের লেবেল সাবধানে পড়লে অপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলো এড়ানো সম্ভব। যদি দেখা যায়, উপাদানের তালিকায় অনেক অপরিচিত নাম অথবা চিনি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বির পরিমাণ বেশি, তবে সেই পণ্য এড়িয়ে চলাই ভালো।
খাবারের পরিকল্পনা: আগে থেকে খাবারের পরিকল্পনা করলে হুটহাট অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার প্রবণতা কমে। স্বাস্থ্যকর নাস্তা এবং খাবার হাতের কাছে প্রস্তুত থাকলে অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি আকর্ষণ কমে যায়।
প্রাকৃতিক খাবার বাড়াতে হবে: খাদ্যতালিকায় বেশি করে প্রাকৃতিক খাবার যুক্ত করতে হবে। রঙিন ফল ও সবজি, গোটা শস্য, বাদাম, বীজ এবং চর্বিহীন প্রোটিন খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
সহজলভ্য প্যাকেটজাত খাবার সীমিত করা: প্যাকেটজাত খাবারের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। যদি কিনতেই হয়, তবে এমন পণ্য বেছে নিতে হবে, যা প্রাকৃতিক রূপের কাছাকাছি এবং যেগুলোতে ক্ষতিকর উপাদান কম মেশানো হয়েছে।
পর্যাপ্ত পানি পান: চিনিযুক্ত পানীয়র পরিবর্তে পানি, ভেষজ চা বা ফলের টুকরো মেশানো পানি পান করে শরীর হাইড্রেটেড রাখা যায়।
নতুন রেসিপি নিয়ে পরীক্ষা করা: এমন সব স্বাস্থ্যকর রেসিপি খুঁজে বের করতে হবে, যা প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করেই অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের মতো স্বাদ বা তৃপ্তি দিতে পারে। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার অতিরিক্ত মাত্রায় গ্রহণ করলে বেশ কিছু গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
সূত্র: এনডিটিভি





