বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ট্রাম্পের কাছে ইউরোপের নিরাপত্তা জটিল সংকটে

ছবি: সিএনএন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গোটা ইউরোপ যেন অসহায়। এতদিনের ধারণা ছিল—মার্কিন বলয়ের মধ্যে থাকা মানেই শতভাগ নিরাপদ। কিন্তু গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্প সেই বিশ্বাসকে আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছেন।

ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ন্যাটোকে নজিরবিহীন সংকটে ঠেলে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির কারণে নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অরগানাইজেশনের (ন্যাটো) কেন্দ্রীয় মূলনীতি এখন ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে।

সামরিক এই জোটের মূলনীতি হলো—যেকোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু জোটের সবচেয়ে প্রভাবশালী সদস্যই অন্য সদস্যের ওপর হামলার হুমকি দিচ্ছে।

গত মঙ্গলবার হোয়াইট হাউস জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে ‘নানা বিকল্প’ নিয়ে আলোচনা করছেন। সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।

ট্রাম্পের উপপ্রধান স্টাফ স্টিফেন মিলার সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “আমরা একটি পরাশক্তি। আমরা পরাশক্তির মতোই আচরণ করব।” তার এই মন্তব্য পুরোনো বিশ্বের সেই সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন শক্তিশালীরা যা পারত দখল করত এবং দুর্বলরা তা মেনে নিত।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছেন। তার ভাষ্যমতে, ট্রাম্প প্রশাসন আসলে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে।

ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন সতর্ক করেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি ন্যাটোর আরেকটি সদস্যদেশের ওপর সামরিক অভিযান চালায়, তাহলে ন্যাটোসহ সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে। একই সঙ্গে সেই নিরাপত্তাব্যবস্থাও (অকার্যকর হয়ে পড়বে), যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গড়ে উঠেছে।”

ইউরোপের অন্যান্য নেতা প্রকাশ্যে নিজেদের কুলুপ এঁটেছেন। তাদের অস্বস্তির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীলতার বাস্তবতা কাজ করছে। রাশিয়ার মোকাবিলায় ইউরোপ এখনও মার্কিন সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। ফলে ট্রাম্পের নতুন হুমকি ইউরোপকে জটিল সমীকরণে ফেলে দিয়েছে—গ্রিনল্যান্ড থেকে দূরে রাখতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে, অন্যদিকে ইউক্রেনের বিষয়ে সক্রিয় রাখতেও হবে।

গত সপ্তাহে প্যারিসে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে এই টানাপোড়েন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেখানে ৩৫ দেশের প্রতিনিধি রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়, কিছু প্রতিশ্রুতিও আসে।

কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের একটি প্রশ্ন চাপা অস্বস্তি প্রকাশ করে। এক সাংবাদিক যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকে জিজ্ঞাসা করেন, “গ্রিনল্যান্ড নিয়ে আপনারা অনীহা প্রকাশ করছেন। কিন্তু ওয়াশিংটনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে ন্যাটোর সদস্যদেশের ভূখণ্ড দখলের কথা বলা হচ্ছে, তখন মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির মূল্য কত?”

স্টারমার সরাসরি উত্তর দেননি; ডেনমার্কের প্রতি সংহতি জানানো আগের বিবৃতি উল্লেখ করেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁকেও একই প্রশ্ন করা হয়, তিনি জবাব এড়িয়ে যান।

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পাশে দাঁড়িয়ে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতারা ট্রাম্পের হুমকির সমালোচনা করতে রাজি হননি। কারণ তাদের আশঙ্কা, এতে ইউক্রেন শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়ায় ওয়াশিংটনের অংশগ্রহণে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

ইউরোপের বহু ছাড় ইতিমধ্যেই দেওয়া হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ইউরোপীয় নেতাদের তিরস্কার করেছিলেন। মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের সমালোচনার পাশাপাশি ইইউ থেকে রফতানি পণ্যের ওপর ১৫% শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।

ইউরেশিয়া গ্রুপের মুজতবা রাহমান বলেন, “ইউরোপের অনেক নেতা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় কথা বলতে চান, কিন্তু বাস্তবে করতে পারছেন না। দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ছেড়ে দিয়েছে ইউরোপ।” তিনি যোগ করেন, ইউরোপের একমাত্র অগ্রাধিকার হলো ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রকে সক্রিয় রাখা। এজন্য গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সমঝোতায় আসতে’ ডেনমার্কের ওপর চাপও তৈরি হতে পারে।

রাহমান আরও বলেন, ইউরোপের কাছে বিকল্প নেই। “নিজস্ব সামরিক শক্তি পুনর্গঠন করতে ইউরোপের তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগবে। ইউক্রেনে নতুন সামরিক সহায়তার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের অনুমোদন চায়নি। ইউরোপ এক বছরের বেশি সময় ধরে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা খরচ বহন করছে।”

ফ্রান্সের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য রাফায়েল গ্লুকসমান ইউরোপকে গ্রিনল্যান্ডে স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। এর মাধ্যমে ট্রাম্পের কাছে শক্ত বার্তা পাঠানো সম্ভব হবে।

তবে ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জ্যেষ্ঠ নীতিবিষয়ক ফেলো মাজদা রুগে মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক মোকাবিলা করা উচিত নয়। বরং যত দ্রুত ও দৃশ্যমানভাবে সম্ভব, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জোটগত চাপ বাড়াতে হবে, যাতে ট্রাম্প এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে সরে আসেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধী। আগস্টে ইউগভের জরিপে মাত্র ৭% সমর্থন দেখায়, ৭২% বিরোধিতা করেন।

ইউরোপের আশা, ট্রাম্পের আগ্রহ কমে যাবে, কিন্তু ন্যাটোর সদর দফতর ও লন্ডন-ইউরোপের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা মনে করছে, এবারের অবস্থান আগের মতো হালকা নয়। ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা নাম না প্রকাশ করে বলেন, “মানুষের মধ্যে ধারণা গড়ে উঠেছে, ট্রাম্প এবার সিরিয়াস।”

মুজতবা রাহমানের মন্তব্য অনুযায়ী, “যুক্তরাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি সম্পর্কে ইউরোপের কাছে সরল ধারণা নেই। বার্লিন, প্যারিস, লন্ডন কেউই জানে না। মার্কিনরা জানে ইউরোপ দুর্বল। শক্তিশালীরা দুর্বলদের শিকার করে। তাই ইউরোপের হাতে সীমিত সুযোগ রয়েছে।”

তিনি যোগ করেন, “যতক্ষণ না ইউরোপ নিজে শক্তিশালী হয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, ততক্ষণ ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কাজ চালাতে বাধ্য থাকবে।”

সূত্র: সিএনএন

শেয়ার করুন