ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ তেল যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের পরিকল্পনা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার দাবি, বাজারমূল্যে বিক্রি হওয়া এই তেলের অর্থ ব্যবহার করা হবে যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার জনগণের স্বার্থে। তবে ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও কূটনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে—এই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে এবং এর আইনি ভিত্তি কী।
মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ এক পোস্টে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলা ৩০ থেকে ৫০ মিলিয়ন বা ৩ থেকে ৫ কোটি ব্যারেল নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে হস্তান্তর করবে। এই তেল দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে স্টোরেজে আটকে ছিল। ট্রাম্প বলেন, তেল বাজারমূল্যে বিক্রি হবে এবং বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যয় হবে তা তিনি নিজেই তদারক করবেন।
ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে, পরিকল্পনাটি ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যে মার্কিন জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, স্টোরেজ জাহাজে তেল সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের আনলোডিং ডকে আনা হবে।
এই ঘোষণার পেছনে ভেনেজুয়েলা ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক কঠোর অবস্থানকে মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে ধরা হচ্ছে। এর আগে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ভেনেজুয়েলার তেল সম্পদ ‘পুনরুদ্ধার’ করার কথা জানিয়েছেন এবং দেশটির জ্বালানি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার জীর্ণ অবকাঠামো সংস্কার ও তেল উত্তোলনে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত—যদিও আন্তর্জাতিক আইনে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের কোনো মালিকানা নেই।
বিশেষজ্ঞরা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের শাসনামলে তেল খাত জাতীয়করণের সময় যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক কোম্পানির সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। পরে আন্তর্জাতিক সালিশে এক্সনমোবিল ও কনোকোফিলিপস যথাক্রমে ১.৬ বিলিয়ন ও ৮.৭ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ পায়, যা ভেনেজুয়েলা সরকার পরিশোধ করেনি। বর্তমানে শেভরনই একমাত্র বড় মার্কিন তেল কোম্পানি, যা ভেনেজুয়েলায় সীমিত পরিসরে কার্যক্রম চালাচ্ছে; দৈনিক উৎপাদন প্রায় দেড় লাখ ব্যারেল।
ট্রাম্পের ঘোষণার বাস্তব প্রভাব নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বিশ্লেষকরা। বিশ্ববাজারে দৈনিক তেলের ব্যবহার ১০ কোটির বেশি ব্যারেল, যেখানে ৩–৫ কোটি ব্যারেল একবারে বা স্বল্প সময়ে সরবরাহ হলেও এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে। হিউস্টনের বেকার ইনস্টিটিউটের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মার্ক ফিনলি বলেন, এই তেল কোন সময়সীমায় সরবরাহ হবে তা স্পষ্ট না হলে ঘোষণার গুরুত্ব নির্ধারণ করা কঠিন। তার মতে, এক মাসে হলে এটি ভেনেজুয়েলার প্রায় পুরো উৎপাদনের সমান, কিন্তু এক বছরে ছড়িয়ে দিলে প্রভাব খুবই সামান্য।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি বিশ্লেষক স্কট মন্টগোমেরি বলেন, তেল বিক্রির অর্থ কে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে—এটাই সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এর মতো নজির খুবই বিরল।
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন নব্বইয়ের দশকের তিন মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতার কাছাকাছি ফিরিয়ে আনার জন্য বিপুল বিনিয়োগ এবং দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন। নরওয়েভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্টাড এনার্জি জানিয়েছে, উৎপাদন দুই মিলিয়ন ব্যারেল দৈনিক করতে অন্তত ১১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার।
একসময় বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি খাত সংকুচিত। যদিও দেশটির হাতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেল মজুত রয়েছে, বর্তমানে বৈশ্বিক উৎপাদনে এর অবদান এক শতাংশেরও কম। এই বাস্তবতায় ট্রাম্পের ঘোষণাকে কেউ রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখছেন, কেউ আবার এটি জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন।





