সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বিরুদ্ধে সামরিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে মন্তব্য করা হয়েছে। দেশটির সেনাবাহিনীর তথ্য ও জনসংযোগ শাখা আইএসপিআরের পরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরীফ চৌধুরী শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে ইমরান খানের সমালোচনা করে বলেন, তিনি ‘মানসিকভাবে অস্থির’, ‘বিভ্রান্ত’ এবং ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি’। এই ধরণের অভিযোগ পাকিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্কের জটিল ইতিহাসে নতুন নয়; বহু সাবেক নেতার বিরুদ্ধেও আগে একই রকম আখ্যা ব্যবহার করা হয়েছে।
পাকিস্তানের ইতিহাসে রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই সামরিক ক্ষমতার সঙ্গে সংঘাতের শিকার হয়েছেন। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করা হয়েছে। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতা গ্রহণের সময় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘সামাজিক কীটপতঙ্গ’ বা ‘জোঁক’ আখ্যা দিয়েছিলেন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের জন্য ‘ইলেক্টিভ বডিস ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডার’ প্রণয়ন করেছিলেন। এই প্রক্রিয়া মূলত রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহকেও একসময় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তার কন্যা বেনজির ভুট্টোকেও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থা পর্যন্ত বেনজিরের উপর আস্থা রাখেনি। সমাজকর্মী ও ইতিহাসবিদ আম্মার আলী জানাচ্ছেন, পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে কখনও বাঙালি জনগোষ্ঠী, কখনও ভুট্টো পরিবার, কখনও ফাতিমা জিন্নাহকে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফও সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফ তাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর আগে থেকেই এই উত্তেজনা চলছিল। ২০২০ সালে নওয়াজ শরীফ ভিডিও বার্তায় উল্লেখ করেছিলেন, যারা সংবিধান লঙ্ঘন করে তারা দেশপ্রেমিক, আর নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতা নাকি দেশদ্রোহী। এই বক্তব্যের পর তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়। এরপর তার কন্যা মরিয়ম নওয়াজের হোটেল রুমে হানা ও হুমকির ঘটনা ঘটে, যেখানে সরাসরি সেনাপ্রধান ও আইএসআই প্রধানকে দায়ী করা হয়।
ইমরান খানের সরকার পতনের আগে ২০২২ সালে সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার উত্তেজনা তীব্র হয়। অনাস্থা ভোটের আগে সেনাবাহিনী সমালোচনা, সেনাপ্রধানকে ‘মীর জাফর’ ও ‘মীর সাদিক’ আখ্যা দেওয়া, এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা না করার ঘটনা সম্পর্কের অবনতি নির্দেশ করে। এই পরিস্থিতিতে আইএসপিআরের সাম্প্রতিক মন্তব্য স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে, ইমরান খানের ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছেছে।
ইতিহাসবিদ আম্মার আলী মনে করান, যারা একসময় রাষ্ট্রদ্রোহী আখ্যা পেয়েছিলেন, পরে প্রমাণিত হয়েছে তারা দেশপ্রেমিক। এধরনের রাজনৈতিক নাটক বারবার জনগণের সামনে প্রদর্শিত হয়। তবে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের নেতৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে এককভাবে আইএসপিআরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা থাকা উচিত নয়। কারণ, নেতৃত্ব নির্বাচনের মূল কর্তৃত্ব জনগণের ভোটেই রয়েছে, সামরিক প্রতিষ্ঠানের নয়। আম্মার আলী আরও প্রশ্ন তোলেন, যদি কেউ সত্যিই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এতটাই বিপজ্জনক, তাহলে তাদের কেন আগে সরকারে সমর্থন দেওয়া হয়েছিল এবং ক্ষমতায় নেওয়া হয়েছিল?





