শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের ‘রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের’ অভিযোগ জাতিসংঘের কমিটির

জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটি জানিয়েছে, ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘সংগঠিত ও ব্যাপক নির্যাতনের একটি কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতি’ অনুসরণ করছে, এমন প্রমাণ তাদের হাতে এসেছে। বিশেষ করে আনলফুল কমব্যাট্যান্টস আইন ব্যবহার করে শিশু, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের আটক করার অভিযোগের সমালোচনা করা হয়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই খবর দিয়েছে।

নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলোর রেকর্ড নিয়মিত পর্যালোচনা করে কমিটি। এ সময় ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আটক কেন্দ্রগুলোর ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর ২০২৩ হামাস হামলার পর ইসরায়েল হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে।

ইসরায়েলের প্রশাসনিক আটক আইন ও আনলফুল কমব্যাট্যান্টস আইনের আওতায় যাদের যুদ্ধবন্দু হিসেবে গণ্য করা যায় না, তাদের দীর্ঘ সময় আইনজীবী বা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়াই রাখা হয়। অনেক ফিলিস্তিনি পরিবার জানায়, মাসের পর মাস তারা জানতে পারেননি প্রিয়জন কোথায়—যা জাতিসংঘ কমিটির ভাষায় ‘জোরপূর্বক গুম’ হিসেবে বিবেচিত।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে বলা হয়েছে, আটক অবস্থায় ফিলিস্তিনিদের নিয়মিত খাদ্য ও পানি থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভয়াবহ মারধর, কুকুর দিয়ে হামলা, ইলেকট্রিক শক, ওয়াটারবোর্ডিং এবং যৌন সহিংসতার শিকার করা হয়। অনেককে স্থায়ীভাবে শৃঙ্খলবদ্ধ রাখা হয়, টয়লেটে যেতে দেওয়া হয় না, ডায়াপার পরতে বাধ্য করা হয়।

কমিটি জানিয়েছে, এসব আচরণ যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। ইসরায়েলের সংগঠিত ও ব্যাপক নির্যাতন কার্যত রাষ্ট্রীয় নীতি আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার অপরাধের উপাদান হতে পারে। যদিও ইসরায়েল গাজায় গণহত্যার অভিযোগ বরাবর অস্বীকার করে আসছে।

কমিটির সদস্য ডেনমার্কের পিটার ভেডেল কেসিং বলেন, তারা যা শুনেছেন তাতে গভীরভাবে স্তম্ভিত। কমিটি ইসরায়েলকে স্বাধীন তদন্ত এবং দায়ীদের, বিশেষ করে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে দাবি করছে। শুনানিতে দেশটির রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল মেরন অভিযোগগুলোকে ‘ভুয়া তথ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের মুখোমুখি হয়েও ইসরায়েল তার নৈতিক দায়িত্ব পালন করছে।”

কমিটি তাদের প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ স্বীকার করেছে। তবে সতর্ক করেছে, এক পক্ষের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন অন্য পক্ষকে তা করার অনুমতি দেয় না।

ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ আইনে বলা হয়েছে, কনভেনশন শুধু ইসরায়েলি ভূখণ্ডে প্রযোজ্য, গাজা ও পশ্চিম তীরের মতো অধিকৃত অঞ্চলে নয়। অনেক আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ এ ব্যাখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন।

এই প্রতিবেদনের পর ইসরায়েলের মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। জেনেভায় জাতিসংঘ মানবাধিকার দফতর জানায়, পশ্চিম তীরে দুই ফিলিস্তিনিকে ইসরায়েলি সেনাদের হত্যা ‘সংক্ষিপ্ত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো’। ভিডিওতে দেখা গেছে, তারা হাত তুলে আত্মসমর্পণ করছিলেন।

এদিকে জাতিসংঘের জরুরি সংস্থাগুলো জানিয়েছে, গাজায় শীত ও বৃষ্টির মধ্যে হাজারো পরিবার এখনও তাঁবুতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না, এবং ইসরায়েলের হামাসবিরোধী বিমান হামলাও অব্যাহত রয়েছে, যদিও সেখানে যুদ্ধবিরতি চলছে।

শেয়ার করুন