মো ইয়াকুব আলী তালুকদার ( স্টাফ রিপোর্টার ) :
আজ বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভয়াবহ খবর ছড়িয়ে পড়েছে। বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান কারাগারে খুন হয়েছেন এবং তার লাশ গোপন করা হয়েছে। তার পরিবার দেখা করতে গেলে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করা হচ্ছে। যদিও এখনো পর্যন্ত এই খবরের নির্ভরযোগ্য কোনো সত্যতার প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি, তবুও গুঞ্জনটি মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে।
এই গুঞ্জন আমাদের সামনে আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে ধরে—গণতন্ত্রের প্রকৃত মুখ আসলে কী? মানুষ বহুদিন ধরে মনে করে এসেছে, গণতন্ত্র নাকি স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার আর মানবাধিকারের প্রতীক। কিন্তু বাস্তবে আমরা যা দেখি, তা প্রায়ই তার সম্পূর্ণ উল্টো। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো যখন চায়, তখন গণতন্ত্রকে তারা স্রেফ একটি খেলনা বানিয়ে ফেলে। জনগণের ভোট, জনগণের ভালোবাসা—এসব কোনো মূল্যই পায় না যখন সুপারপাওয়ারদের স্বার্থের সঙ্গে তা মিলে না।
ইমরান খান এর একটি বড় উদাহরণ। তিনি ছিলেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। একজন স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে তিনি আমেরিকার আগ্রাসী নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিদান কী পেলেন? তাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো। বছরের পর বছর ধরে তিনি বন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। একজন মানুষের বিপুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো তার প্রতি কোনো দয়া দেখায়নি।
এটাই গণতন্ত্রের বাস্তব রূপ—যেখানে জনগণের ইচ্ছা নয়, বরং সুপারপাওয়ারদের স্বার্থই আসল সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। তারা যাকে চায় তাকেই ক্ষমতায় বসায়, যাকে চায় তাকে সরিয়ে দেয়। জনগণ সেখানে শুধু দর্শক, সিদ্ধান্তের মালিক নয়। তাই গণতন্ত্র কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতার নিশ্চয়তা নয়।
ইসলাম আমাদের যে ব্যবস্থা দিয়েছে, সেটি সম্পূর্ণ বিপরীত। ইসলামী শাসনব্যবস্থায় কোনো বিদেশি শক্তির ইচ্ছা সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে না। আল্লাহর নির্দেশ, ন্যায়বিচার, জুলুমের বিরুদ্ধে অবস্থান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা—এসবই ইসলামি রাজনীতির মূল ভিত্তি। ইসলামে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়, জবাবদিহিতা, এবং মানুষের সম্মান রক্ষার নীতির উপর।
ইমরান খান জীবিত থাকুন বা মৃত্যুর গুজব সত্য হোক—দুই অবস্থাই আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। তা হলো, গণতন্ত্র নামের এই ব্যবস্থা মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি হয়নি; বরং এটি এমন এক কাঠামো যেখানে ক্ষমতাধরদের স্বার্থই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। একজন নেতা জনগণের ভালোবাসা পেলেও যদি বিদেশি শক্তিদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে যায়—তাকে সরাতে সময় লাগে না।
এখন প্রশ্ন হলো—তাহলে পরিবর্তন কোথায়? পরিবর্তন কখনোই গণতন্ত্রের স্লোগানে আসে না। পরিবর্তন আসে তখন, যখন মানুষ নিজেকে আল্লাহর নির্দেশের প্রতি আত্মসমর্পণ করে। যখন সমাজে সত্য, ন্যায়, আমানতদারি, সৎ সাহস এবং আল্লাহভীতি প্রতিষ্ঠা পায়। ইসলামী শরীয়তের গুরুত্ব এখানেই—এটি মানুষের ইচ্ছা নয়, আল্লাহর বিধানের উপর রাষ্ট্র গড়ে তোলে।
গণতন্ত্রের ভাঙাচোরা স্বপ্নে ডুবে থাকা অনেক মানুষ এখনো বুঝতে পারে না—কোনো ব্যবস্থা তখনই টিকে থাকে যখন তার ভিত্তি সত্যের উপর দাঁড়ায়। আর সত্য হলো: আল্লাহর বিধান ছাড়া কোনো ব্যবস্থাই মানুষকে ন্যায় দিতে পারে না, স্বাধীনতা দিতে পারে না, মর্যাদা দিতে পারে না।
আজ ইমরান খানের গুঞ্জন আমাদের শেখায়—গণতন্ত্রের নামের এই আড়ালে কত বড় অমানবিকতা লুকিয়ে থাকে। একদিকে মানবাধিকারের স্লোগান, অন্যদিকে ক্ষমতার দখলদারী। একদিকে স্বাধীনতার দাবি, অন্যদিকে দুর্বল দেশগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি।
তাই আমাদের উচিত—এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিন্তা করা।
কোনো গুঞ্জন সত্য-মিথ্যা যাই হোক—এটি আমাদের সামনে একটি বাস্তব শিক্ষা রেখে যায়: সুপারপাওয়ারদের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র দিয়ে কখনোই ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সত্যিকার পরিবর্তন আসবে তখনই, যখন মানুষ আল্লাহর বিধানকে গ্রহণ করবে, ইসলামী ন্যায়ের প্রতি ফিরবে, এবং নিজেদের জীবন-সমাজ-রাষ্ট্রকে সেই আলোকে সাজাবে।
আমরা চাই—ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, সত্য ও স্বচ্ছতার উপর দাঁড়ানো একটি সমাজ এবং রাষ্ট্র। আর সেটি আসে কেবল এক পথেই—আল্লাহর দেওয়া সরল-সঠিক শরিয়তের পথে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে। এটাই আজকের ঘটনা থেকে নেওয়ার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।





