বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা—এমন ইঙ্গিত মিলছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সম্প্রতি আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। তবে এই রায় কার্যকর করার পথে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রতিবেশী ভারত। মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন শনিবার (২২ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বিশ্লেষণ তুলে ধরে।
সংবাদমাধ্যমটির ভাষ্য অনুযায়ী, কখনো ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ছিলেন শেখ হাসিনা। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা। ১৯৭০-এর দশকে বাবার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ধীরে ধীরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন।
তবে দীর্ঘ রাজনীতিক জীবনের শীর্ষে অবস্থান করার পর সাম্প্রতিক আন্দোলনে তার ক্ষমতাচ্যুতি ঘটে। ছাত্র-জনতার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে সরকার পতন এবং পরবর্তীতে গোপনে ভারতে আশ্রয় নেওয়া—তার রাজনৈতিক যাত্রাকে নাটকীয়ভাবে পাল্টে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন শুধু একটাই—দিল্লি তাকে ফিরিয়ে দেবে কি না। সে সিদ্ধান্তই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা নির্ধারণ করবে।
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন দমন করতে গিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হন তিনি। সহিংস আন্দোলন শেষ পর্যন্ত তার সরকারের পতন ঘটায়। পনেরো বছরের ক্রমাগত শক্ত হাতে শাসনের পর গত আগস্টে তিনি ভারতে পালিয়ে যান, যেখানে একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ তাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয়।
বর্তমানে তিনি ভারত–বাংলাদেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। কারণ ঢাকা বারবার আনুষ্ঠানিকভাবে তার প্রত্যর্পণ দাবি করছে। বাংলাদেশি বিশ্লেষক মুবাশ্বর হাসান বলেন, “তিনি জনরোষ এড়াতে দেশ ছাড়েন। ভারতে লুকিয়ে থাকতেই মৃত্যুদণ্ড পেলেন—ঘটনার নাটকীয়তা এখানেই।”
রক্তাক্ত অতীত
শেখ হাসিনার জীবনপথকে অনেক গবেষক শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডির সঙ্গে তুলনা করেন—যেখানে রয়েছে দুঃখ-বেদনায় ভরা ঘটনা, দীর্ঘ নির্বাসন ও ক্ষমতার টানা–হেঁচড়া। বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে হিসেবে দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
কিন্তু ১৯৭৫ সালের আগস্টের ভয়াবহ রাতে পরিবর্তন হয়ে যায় তার জীবন।
সেনা কর্মকর্তাদের অভ্যুত্থানে ঢাকায় নিহত হন তার বাবা-মা ও তিন ভাই। সে সময় হাসিনা ও তার ছোট বোন পশ্চিম জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় উঠে আসেন—যিনি ছিলেন পরবর্তী সময়ে হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার স্বামী।
ঐ ঘটনার পর হাসিনা হঠাৎই হয়ে পড়েন নির্বাসিত। প্রায় ছয় বছর ভারতেই থাকতে হয় তাকে। সেই সময়ই ভারতের প্রতি বিশেষ আস্থা তৈরি হয় তার, যা পরবর্তী রাজনৈতিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করে। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি দেখেন—আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের জন্য তাকে কেন্দ্র করেই জনমানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক ময়দানে আবির্ভূত হন খালেদা জিয়াও। এখান থেকেই শুরু হয় দুই নেত্রীর দীর্ঘ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব।
ক্ষমতার লড়াই
আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব পেতে হাসিনাকে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নানা দমন-পীড়ন, গৃহবন্দী থাকা ও আইনগত বাধার মধ্য দিয়েই তিনি দলকে নেতৃত্ব দেন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হলে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি ১৯৭৫ সালের হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু করেন।
তবে এক মেয়াদের পর ক্ষমতা হারান। ২০০৮ সালে আবার নির্বাচনে জিতে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হলে তার নেতৃত্বে আসে দৃঢ়তা এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা। ১৫ বছরের শাসনামলে একদিকে ছিল দ্রুত উন্নয়ন, অন্যদিকে বিরোধী দলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার মতো বিতর্ক।
ভারতের সঙ্গে কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা তাকে আঞ্চলিক রাজনীতিতে বিশেষ শক্তি এনে দেয়—যা পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব ঠেকাতে ভারতের জন্যও ছিল সুবিধাজনক।
তবে দেশে সমালোচনা বাড়তেই থাকে। অনেকেই মনে করেন, দেশ একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছিল। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছিল, “চাপে থাকা হাসিনা ভারতের অকুণ্ঠ সমর্থন ছাড়া আর কারও ওপর নির্ভর করতে পারছিলেন না।”
ছাত্র আন্দোলনে পতন
অতীতের বহু আন্দোলন ও হত্যাচেষ্টা ফিরে আসলেও টলেনি হাসিনার সরকার। কিন্তু গত বছরের শিক্ষার্থী আন্দোলন ছিল ভিন্ন। সরকারি চাকরির কোটা সংশোধন আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। কঠোর দমন-পীড়নে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
সহিংসতা আন্দোলনকে দমাতে পারেনি। বরং আরও তীব্র করে তোলে। শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ঘটে। বিশ্লেষক মুবাশ্বর হাসান বলেন, “দেশ ছেড়ে পালানোই প্রমাণ করে তিনি সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।”
মৃত্যুদণ্ডের রায়
ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় নেওয়ার মধ্য দিয়ে যেন কয়েক দশক আগের নির্বাসনচক্রেই ফিরে গেলেন তিনি। অনুপস্থিতিতেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল—
• আন্দোলনকারীদের হত্যা করতে নির্দেশ দেওয়া
• ফাঁসির আদেশ দেওয়া
• ড্রোন, হেলিকপ্টার, অস্ত্র ব্যবহার করে দমন-পীড়নের অনুমতি দেওয়া
আদালতের ভাষ্যমতে, এসব নির্দেশ সরাসরি শেখ হাসিনার কাছ থেকেই এসেছে। রায় ঘোষণার সময় আদালতকক্ষ কান্না ও করতালির শব্দে ভরে যায়। নিহত এক ছাত্রের বাবা আবদুর রব বলেন, “এ সিদ্ধান্তে স্বস্তি পেলেও পূর্ণ বিচার পাব যখন তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখব।”
ভারত রায়কে স্বীকৃতি দিয়ে নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে। হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, “ভারত আমাদের সত্যিকারের বন্ধু—ওরা আমার মায়ের জীবন রক্ষা করেছে।”
ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত বলেন, ভারত তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবে—এ সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ দুই দেশের প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ‘রাজনৈতিক অপরাধে’ কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। আর ভারত সেই ব্যাখ্যাটিই ব্যবহার করতে পারে।
তিনি আরও জানান, হাসিনার সামনে এখনো সুপ্রিম কোর্ট ও আন্তর্জাতিক আদালতে আপিল করার সুযোগ আছে। তাই দিল্লি কোনো সিদ্ধান্ত দ্রুত নেবে না।
রায়ের পরদিন বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও ভারতের কাছে তাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানায়—“হাসিনাকে ফিরিয়ে দেওয়া ভারতের দায়িত্ব,” চিঠিতে এমনটাই উল্লেখ করা হয়।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ, নেতৃত্বও অনিশ্চিত। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশের গভীর রাজনৈতিক বিভাজন কমানোর চেষ্টা করছে।
এ পরিস্থিতিতে বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। আওয়ামী লীগও হয়তো ফিরে আসার পথ খুঁজবে, তবে তা শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে নয়—এমনই ধারণা বিশ্লেষকদের।





