২০২২ সালের নভেম্বর থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে থাকা ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এখন দেশটির নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর তদারকির দায়িত্বও পাবেন।
পাকিস্তান পার্লামেন্ট বৃহস্পতিবার ভোটাভুটির মাধ্যমে সেনাপ্রধান মুনিরকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে। একই সঙ্গে তাকে ভবিষ্যতে গ্রেফতার বা আইনি বিচারের মুখোমুখি না হওয়ার নিশ্চয়তা দিয়ে আজীবন দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সমালোচকদের মতে, উদ্যোগটি দেশটিকে আরও স্বৈরশাসনের দিকে ঠেলে দেবে।
রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরের পর সংশোধিত সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী আইন হিসেবে কার্যকর হয়েছে। নতুন এই পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশটির সর্বোচ্চ আদালতগুলোর কাঠামো ও কার্যপ্রণালীতে বড় ধরনের রদবদল আসবে।
পরিবর্তনের সমর্থকদের দাবি—এটি সেনাবাহিনীর প্রশাসনিক কাঠামোকে স্পষ্ট করবে এবং আদালত ব্যবস্থার ওপর চাপও কিছুটা কমাতে সহায়তা করবে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শক্তি হিসেবে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। কখনো তারা সরাসরি ক্ষমতা দখল করেছে, আবার অনেক সময় পেছন থেকে সরকার পরিচালনায় প্রভাব রেখেছে।
আগের সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হক ও পারভেজ মোশাররফের সময়েও দেশটি বহুবার অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছে, যার কারণে দেশটিতে বেসামরিক ও সামরিক ক্ষমতার দ্বৈত ভারসাম্যকে ‘হাইব্রিড’ শাসন বলা হয়। বর্তমান সংশোধনীর ফলে সেই ভারসাম্য সামরিক প্রতিষ্ঠানের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়েছে বলে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের সাউথ এশিয়া ইনস্টিটিউটের প্রধান মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, “আমার কাছে এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকেত—পাকিস্তান আর আগের মতো হাইব্রিড কাঠামোয় নেই। এটি এক ধরনের নতুন পরবর্তী-হাইব্রিড ব্যবস্থায় ঢুকে পড়েছে।”
তার মতে, বেসামরিক ও সামরিক ক্ষমতার দূরত্ব এখন “চরমভাবে একপেশে”।
বিচার বিভাগের ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ
সংশোধনীর সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ বিচার ব্যবস্থা নিয়ে।
নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী, সংবিধানবিষয়ক মামলা দেখভালের জন্য একটি ‘ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট’ বা এফসিসি গঠন করা হবে। এর প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকদের নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। মানবাধিকার আইনজীবী আইমা জাহাঙ্গীর মনে করেন—এর ফলে ন্যায়বিচারের মৌলিক রূপই বদলে যাবে।
তিনি বলেন, বিচারকদের নিয়োগ ও সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠন এখন নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মামলাকারীরা নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার ব্যাপারে আস্থাহীন হয়ে পড়বেন।
সাংবাদিক আরিফা নূরও মনে করেন, আদালত এখন কার্যত সরকারের তত্ত্বাবধানে চলে যাবে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকুচিত হবে।
এর আগে সাংবিধানিক বিষয়গুলো সুপ্রিম কোর্টই শুনত, যা কিছু জট তৈরি করেছিল বলে সমর্থকেরা দাবি করেন। কিন্তু আইনজীবী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন—এই যুক্তি টেকসই নয়, কারণ দেশের অধিকাংশ বিচারাধীন মামলা সুপ্রিম কোর্টে আটকে নেই। তার মতে, বাস্তব সংস্কারের জায়গা ছিল একেবারে নিচের স্তরের আদালতগুলো।
সংশোধনী কার্যকর হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতি পদত্যাগ করেন।
বিচারপতি আতহার মিনাল্লাহ বলেন, তিনি যে সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন—তা আর কার্যকর নেই।
বিচারপতি মনসুর আলী শাহ অভিযোগ করেন যে, এই সংশোধনী সুপ্রিম কোর্টকে কার্যত ভেঙে দিয়েছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ অবশ্য বলেন, এসব বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন কারণ সংসদ শীর্ষ আদালতের ‘একাধিকার’ ভেঙে সংবিধানের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিচারকদের বাধ্যতামূলক বদলি সম্ভব
নতুন নিয়ম অনুযায়ী বিচারকদের সম্মতি ছাড়াই দেশজুড়ে বিভিন্ন আদালতে বদলি করা যাবে। যদি কেউ এ বদলিতে আপত্তি করেন, তারা বিচার বিভাগীয় কমিশনে আপিল করতে পারবেন; তবে আপত্তির কারণ টেকসই না হলে অবসর নিতে হবে।
সমালোচকরা মনে করছেন—এটি বিচারকদের ওপর চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন বিচারককে হঠাৎ অন্য অঞ্চলে পাঠানোর হুমকি তাকে সরকারপন্থী অবস্থানে ঠেলে দিতে পারে। এতে ক্ষমতার ভারসাম্য আরও ভেঙে পড়বে।
মাইকেল কুগেলম্যানও সতর্ক করে বলেন—এ ধরনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য শুভ সংকেত নয়।
আরিফা নূরের ধারণা—এটি পাকিস্তানে বাড়তে থাকা কর্তৃত্ববাদের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
তিনি আরও জানান, এই ২৭তম সংশোধনী আসলে গত বছরের ২৬তম সংশোধনীর ধারাবাহিকতা—যেখানে সংসদকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে ২৮তম সংশোধনীর গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।





