শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিবিসিতে বড় পরিবর্তন: মহাপরিচালক ও সংবাদ প্রধানের একসঙ্গে পদত্যাগ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্রের ভুল সম্পাদনা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর পদত্যাগ করেছেন ব্রিটিশ গণমাধ্যম জায়ান্ট বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি এবং সংবাদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী ডেবোরাহ টার্নেস।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক অভ্যন্তরীণ নথি প্রকাশ করে জানায়, বিবিসির প্যানোরামা নামের ডকুমেন্টারিতে ট্রাম্পের ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারির বক্তব্যের দুটি আলাদা অংশ এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছিল, যাতে মনে হয় তিনি সরাসরি ক্যাপিটল হিলে হামলার আহ্বান জানাচ্ছেন।


ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর বিবিসির নিরপেক্ষতা ও সম্পাদকীয় নীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। ব্রিটিশ রাজনীতিকরা আশা প্রকাশ করেছেন, এই পদত্যাগ বিবিসির কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা করবে। অন্যদিকে ট্রাম্প মন্তব্য করেছেন, এই পদত্যাগ ন্যায়সংগত ও প্রয়োজনীয়।


বিবিসির ইতিহাসে এটি এক বিরল ঘটনা—একই দিনে সংস্থার মহাপরিচালক ও সংবাদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী উভয়েই দায়িত্ব ছাড়লেন।

রোববার (৯ নভেম্বর) সন্ধ্যায় টিম ডেভি নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, “বিবিসি নিখুঁত নয়, তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বজায় রাখা আমাদের কর্তব্য। সাম্প্রতিক বিতর্কই আমাকে এই সিদ্ধান্তে আনতে বাধ্য করেছে। একজন পরিচালক হিসেবে সব ভুলের দায় শেষ পর্যন্ত আমারই।”


অন্যদিকে ডেবোরা টার্নেস এক বিবৃতিতে জানান, প্যানোরামা বিতর্ক এখন বিবিসির সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে, তাই পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিনি আরও বলেন, “জনসমক্ষে কাজ করা নেতৃত্বের জন্য সম্পূর্ণ জবাবদিহি অপরিহার্য। তবে বিবিসি নিউজকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট বলা একটি ভুল ধারণা।”


দ্য টেলিগ্রাফ-এর নথিতে বিবিসির আরবি বিভাগে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের প্রতিবেদনে পক্ষপাতের অভিযোগও তোলা হয়েছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়, ট্রাম্পের ভাষণের মূল অংশে তিনি বলেছিলেন, “আমরা ক্যাপিটলে যাব এবং সাহসী সিনেটরদের উৎসাহ দেব।”

কিন্তু প্যানোরামা-এর সম্পাদিত সংস্করণে দেখানো হয়—“আমরা ক্যাপিটলে যাব… আমি তোমাদের সঙ্গে থাকব। আমরা লড়ব, জোরে লড়ব।” এই দুটি বাক্য আসলে ট্রাম্পের বক্তৃতায় প্রায় ৫০ মিনিটের ব্যবধানে ছিল।


ঘটনাটির পর হোয়াইট হাউস বিবিসিকে “সম্পূর্ণ ভুয়া সংবাদমাধ্যম” আখ্যা দেয়।


সেদিনই (৯ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, “বিবিসির শীর্ষ কর্মকর্তারা পদত্যাগ করছেন কারণ তারা আমার ‘নিখুঁত ভাষণ’ বিকৃত করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। এরা গণতন্ত্রের শত্রু।”


বিবিসির চেয়ারম্যান সামির শাহ এই পদত্যাগকে প্রতিষ্ঠানের জন্য “এক দুঃখজনক দিন” হিসেবে উল্লেখ করে জানান, বোর্ড টিম ডেভির প্রতি সবসময় আস্থা রেখেছিল, তবে ব্যক্তিগত ও পেশাগত চাপের কারণেই তিনি পদত্যাগ করেছেন।

এই নথিটি লিখেছিলেন মাইকেল প্রেস্কট, যিনি বিবিসির সম্পাদকীয় মান যাচাই কমিটির সাবেক স্বাধীন উপদেষ্টা। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিবিসি ট্রান্সজেন্ডার ইস্যু সম্পর্কিত প্রতিবেদনে পক্ষপাত দেখিয়েছে।


সম্প্রতি বিবিসি স্বীকার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি নিরপেক্ষতা সংক্রান্ত অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে উপস্থাপক মার্টিন ক্রক্সালের সরাসরি সম্প্রচারে স্ক্রিপ্ট বদলে ফেলা, গাজা নিয়ে তৈরি এক ডকুমেন্টারিতে হামাস কর্মকর্তার ছেলের সম্পৃক্ততা গোপন রাখা এবং গ্লাস্টনবেরি উৎসবে “ডেথ টু আইডিএফ” স্লোগানসমৃদ্ধ গান সম্প্রচার।


বিবিসির সাবেক নিউজ প্রধান রজার মোসি বলেন, “ট্রাম্পের ভাষণ বিকৃত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এবং বিবিসি প্রতিক্রিয়ায় দেরি করেছে।”


চ্যানেল ৪–এর সাবেক নিউজ প্রধান ডরোথি বাইর্নও একে “গুরুতর ভুল” বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, বিবিসি ক্ষমা চাইতে দেরি করেছে।

২০ বছর ধরে বিবিসির সঙ্গে যুক্ত টিম ডেভি বলেন, তার পদত্যাগ কার্যকর হবে এমন সময়ে, যাতে নতুন মহাপরিচালক রয়্যাল চার্টার প্রণয়নের আগেই প্রতিষ্ঠানটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারেন।


ব্রিটিশ সংস্কৃতি সচিব লিসা ন্যান্ডি বলেন, “বিবিসি আমাদের জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এবং টিম ডেভি কঠিন এক সময়ে সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন।”

কনজারভেটিভ নেতা কেমি বাডেনোক পদত্যাগকে যথাযথ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “বিবিসিতে দীর্ঘদিনের পক্ষপাত ও ব্যর্থতার সংস্কার না হলে জনগণের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক লাইসেন্স ফি আদায়ের যৌক্তিকতা থাকে না।”
লিবারেল ডেমোক্র্যাট নেতা স্যার এড ডেভি মনে করেন, এটি বিবিসির জন্য “নতুন অধ্যায় শুরু করার সুযোগ।”
রিফর্ম ইউকের নেতা নাইজেল ফারাজ বলেন, “এখনই সময় বিবিসিকে ভেতর থেকে পরিবর্তনের।”


বর্তমানে বিবিসি বোর্ডের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব—একজন নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ করা। কে এই সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানটির হাল ধরবেন, সেটাই এখন যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম অঙ্গনের আলোচ্য বিষয়।

শেয়ার করুন