২০২৩ সালের জানুয়ারিতে মুক্তি পায় আফরান নিশোর প্রথম সিনেমা ‘সুড়ঙ্গ’। মুক্তির আগেই বাংলাদেশজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা—অনেকে বলেছিলেন, অবশেষে শাকিব খানের প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বীর দেখা মিলেছে। একই সময়ে অপূর্ব, আফরান নিশো, শরিফুল রাজ, সিয়াম আহমেদের মতো তারকাদের উত্থানে বাংলাদেশের সিনেমা অঙ্গনে নতুন প্রজন্মের আধিপত্য চোখে পড়ছিল। তাদের অভিনয় ও সিনেমাগুলো ব্যবসায়িকভাবেও ভালো সাড়া পাচ্ছিল। তবু বিনোদন অঙ্গনের অন্দরমহলের খবর বলছে, দেশ-বিদেশের দর্শকের চোখে এখনো ‘সুপারস্টার’ বলতে একমাত্র শাকিব খানকেই বোঝানো হয়। ঢালিউডে তাকে কেন্দ্র করেই যেন পুরো ইন্ডাস্ট্রি ঘোরে—ঠিক যেমন পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে টালিউড। এই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও শাকিব খানের উপস্থিতি থাকছে একাধিক বড় পর্দার ছবিতে। আনন্দবাজার ডটকমের তথ্যানুসারে, পশ্চিমবঙ্গের তাসনিয়া ফারিন ও কলকাতার জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডুকে নিয়ে তিনি অভিনয় করতে যাচ্ছেন ‘প্রিন্স’ নামের নতুন সিনেমায়। পাশাপাশি আগামী বছর মুক্তি পেতে পারে তার আরও তিনটি প্রজেক্ট।

বর্তমানে যে অবস্থানে শাকিব খান, সেখানে পৌঁছানো মোটেই সহজ ছিল না। প্রায় ২৬ বছর আগে অভিনয় জগতে পা রাখেন তিনি। সেই সময় শাকিল খান, ফেরদৌস ও রিয়াজের মতো তারকারা বড় পর্দায় রাজত্ব করছিলেন। শাকিব তখন ছিলেন আলোচনার পেছনের সারিতে। এক সময় সংবাদমাধ্যমে তাকে নিয়ে রীতিমতো ব্যঙ্গাত্মক তকমাও চালু ছিল। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই শাকিবই আজ বাংলাদেশের রুপালি পর্দার একচ্ছত্র অধিপতি—এমনটাই মন্তব্য করেছেন তার এক ভক্ত। শাকিব খানের সিনেমা শুধু দেশেই নয়, বিদেশের দর্শকদের কাছেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। নিউইয়র্কের টাইমস স্কয়ারেও তার ছবির প্রচারণা জায়গা করে নিয়েছে। প্রশ্ন হলো—কীভাবে তিনি নিজেকে এমন উচ্চতায় নিয়ে গেলেন? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ‘তুফান’ ও ‘তাণ্ডব’ সিনেমার পরিচালক রায়হান রাফী। তার ভাষায়, “শাকিব ভাই নিজেকে সব সময় সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে জানেন। তিনি অসম্ভব পরিশ্রমী এবং চরিত্রের প্রয়োজনে নিজেকে পুরোপুরি সঁপে দিতে পারেন।” নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, একবার টানা শুটিংয়ের সময় শাকিব খানের রক্তচাপ বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু তিনি কাউকে কিছু জানাননি, যাতে কাজ বন্ধ না হয়। শুধু তাই নয়, একটি ছবির প্রয়োজনে অল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য ওজন কমানোর চ্যালেঞ্জও সফলভাবে পূরণ করেছিলেন তিনি।

অন্যদিকে ‘বরবাদ’ সিনেমার প্রযোজক শাহরিন সুমি মনে করেন, শাকিবের এই দীর্ঘ স্থায়িত্বের পেছনে এই প্রজন্মের পরিচালকদের অবদানও বড়। তার মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে ভাঙতে পেরেছেন বলেই আজও তিনি শীর্ষে। যেখানে তার সমসাময়িক অনেকেই আজ আর নিয়মিত কাজে নেই, সেখানে শাকিব এখনো সমান সক্রিয়। নতুন প্রজন্মের নায়করা—অপূর্ব, নিশো, শরিফুল ও সিয়াম—সবাই প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তাকে সম্মানজনক জায়গা ছেড়ে দিয়েছেন। বাংলাদেশের এক দর্শক নূর বলেন, “ঈদে একসঙ্গে অনেক সিনেমা মুক্তি পায়। কিন্তু শাকিব খানের ছবি থাকলে অন্য ছবিগুলোর আলোচনাও বেড়ে যায়। তিনি যেন নিজের সিনেমার পাশাপাশি অন্যদের ব্যবসাও ধরে রাখেন।” ২০২৩ সালে নিশোর ‘সুড়ঙ্গ’ মুক্তির সময়ও এমন চিত্র দেখা গেছে। ছবিটি ব্যবসায়িকভাবে সফল হলেও শাকিবকে ছাপিয়ে ‘সুপারস্টার’ হওয়ার আলোচনা থেমে যায় এক বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে। নূরের দাবি, বাংলাদেশের দর্শক শাকিব খানের বিষয়ে নেতিবাচক কিছু মেনে নিতে চান না। এ ছাড়া বাংলাদেশের সিনেমা নির্মাণের গতি তুলনামূলক ধীর। যেখানে শাকিব বছরে একাধিক সিনেমায় কাজ করেন, সেখানে অন্য নায়করা দুই-তিন বছরে একটি করে ছবি করেন। ফলে জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে তারা তাকে ছুঁতে পারেন না।

শাকিবের জনপ্রিয়তার আরেকটি বড় কারণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে তার বিপরীতে কলকাতার নায়িকাদের উপস্থিতি। মিমি চক্রবর্তী, ইধিকা পাল, দর্শনা বণিকের পর সামনে আসছে জ্যোতির্ময়ী কুণ্ডুর নামও। এ প্রসঙ্গে পরিচালক ও প্রযোজক উভয়েই জানিয়েছেন, নায়িকা নির্বাচন মূলত হয় গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী। তবে শাকিবের বিপরীতে কলকাতার নায়িকাদের পরপর হিট পাওয়ায় প্রযোজকদের আগ্রহও সেদিকেই ঝুঁকছে। ‘অন্তরাত্মা’ সিনেমার সহশিল্পী দর্শনা বণিক বলেন, “শাকিব ভাই প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলাচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে জানেন। এটাই ওনার বড় শক্তি।” তিনি আরও জানান, প্রতিটি দৃশ্য নিখুঁত করার জন্য শাকিব একের পর এক শট দিতে থাকেন—কোনো বিরক্তি বা ক্লান্তি প্রকাশ করেন না।
আজকের পরিবর্তিত সিনেমা বাস্তবতায় অনেক নায়কের অবস্থান নড়বড়ে। ভবিষ্যতে প্রেম বা অ্যাকশনধর্মী ছবির চাহিদা কমতে পারে—তবু শাকিব খান এখনো পর্দায় ‘নায়ক’ হিসেবেই বহাল। পরিচালক রায়হান রাফীর বক্তব্য, “ওনার ভেতরে শক্তিশালী অভিনেতাসত্তা কাজ করে। তাই অ্যাকশনের পাশাপাশি সংবেদনশীল ও নাটকীয় দৃশ্যে নিজেকে নতুন করে প্রমাণ করতে সব সময় আগ্রহ দেখান।”





