রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ

NTRCA নিয়োগে অনিয়ম: ১-১২তম বৈধ নিবন্ধনধারীরা ন্যায্য চাকরির অপেক্ষায়

মো ইয়াকুব আলী তালুকদার (স্টাফ রিপোর্টার):

আজ ২৬ নভেম্বর (বুধবার) দীর্ঘদিন ধরে ১ থেকে ১২তম বৈধ শিক্ষক নিবন্ধিত নিয়োগ বঞ্চিত শিক্ষকেরা চাকরির প্রত্যাশায় দিনরাত আন্দোলন করলেও বেকারত্বের ঘানি মাথায় নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। বাংলাদেশ তার জন্মলগ্ন থেকেই এক কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে—গণহত্যা, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও বারবার নেতৃত্বের সংকট। ১৯৭১ সালের গণহত্যা নিছক অতীতের ঘটনা নয়; এটি এখনো রাষ্ট্রচিন্তায় গভীর ক্ষতের মতো উপস্থিত। কিন্তু এর পরবর্তী অধ্যায়—স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের দায়িত্ব—আমরা কতটা পালন করেছি, সেটিই আজ বহুলাংশে অনালোচিত।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে দেশের সাধারণ মানুষ যে গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি করেছিল, তা দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নির্যাতন, দমন-পীড়ন ও হতাশার বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিবাদ ছিল। এই আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ক্ষমতা পরিবর্তন হলো; নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলো। এক নতুন আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিল—হয়তো এবার গণতন্ত্র ফিরবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে দাঁড়াবে, এবং দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটতে শুরু করবে।

কিন্তু বাস্তবতা দ্রুতই হতাশাজনক প্রমাণ করল। যেসব প্রশ্ন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে—কৃষকের ন্যায্যমূল্য, শিল্পের টিকে থাকা, শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, শিক্ষা ব্যবস্থার ভাঙন, বা শিক্ষক নিয়োগে ভয়াবহ দুর্নীতি—এই বিষয়গুলো আবারও রাজনৈতিক তর্ক-বিতর্কের প্রান্তে সরে গেছে। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে জায়গা করে নিয়েছে পুরনো দোষারোপের রাজনীতি:

  • কে ভারতপন্থী বা বিরোধী,

  • কে ইসলামবিদ্বেষী,

  • কে দেশদ্রোহী,

  • কোন গোষ্ঠী কার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করছে।

রাষ্ট্রচিন্তার জায়গাটি আবারও পরিণত হয়েছে পরিচিত ক্ষমতার খেলায়—যেখানে যুক্তি নয়, কাজ করে বিভাজন; যেখানে নীতি নয়, মুখ্য হয়ে উঠেছে তকমা। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিকে ঘিরে নীরবতা।

শিক্ষক নিবন্ধনের ৬০ হাজার (বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত) জাল সনদ দিয়ে ১ম থেকে ১২তম প্রকৃত সনদধারীদের বঞ্চিত করে এক আস্তা কুঁড়ে ফেলা হয়েছে। প্রকৃত নিবন্ধনধারীদের রোল নম্বর ব্যবহার করে ৬০ হাজারেরও বেশি জাল সনদ দিয়ে তাদের দোসরদের চাকরি দেওয়ার মতো রাষ্ট্রীয় অপরাধ—এটি যে কোনো দেশে জাতীয় সংকট হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এখানে এটি পরিণত হয়েছে আরেকটি “গায়েব” ইস্যুতে। যেন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সীমাহীন দুর্নীতি আমাদের কাছে আর আশ্চর্যের কিছু নয়।

NTRCA নিয়োগে অনিয়ম—রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত নিবন্ধনধারীরা, বিশেষ করে ১-১২তমরা।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা জাতির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, এই মেরুদণ্ড আজ ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (NTRCA) প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষকদের স্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এই প্রতিষ্ঠানটি যোগ্যতার চেয়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও তদবিরের মাধ্যমে নিয়োগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

ন্যায়বিচারের আশা থেকে বঞ্চিত এক প্রজন্ম: NTRCA-এর বিধি অনুযায়ী, পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই শিক্ষকতার জন্য যোগ্য। ১ম থেকে ১২তম নিবন্ধনধারীরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। কিন্তু তাদের নিয়োগ না দিয়ে, বরং কিছু অসাধু কর্মকর্তা জাল সনদ বিক্রি করে অবৈধভাবে অন্যদের নিয়োগ দিয়েছেন—এটি কেবল দুর্নীতি নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকাশ্য অবমাননা। যে প্রার্থীরা বছরের পর বছর ধরে যোগ্যতা প্রমাণ করেও নিয়োগ থেকে বঞ্চিত, তাদের মানসিক ও সামাজিক ক্ষতির দায় কে নেবে? এ যেন রাষ্ট্র তাদের নাগরিকত্বকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বিগত সরকারের ভূমিকা: উদাসীনতা নাকি প্রভাবশালী মহলের স্বার্থরক্ষা! যে সরকার ন্যায্য নিয়োগের নামে একটি কর্তৃপক্ষ গঠন করেছিল, সেই সরকারই পরবর্তীতে সেই কর্তৃপক্ষের অনিয়মে চোখ বন্ধ করে ছিল। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও প্রকৃত নিবন্ধনধারীদের নিয়োগ না দেওয়া—এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত। উদাসীনতা প্রমাণ করে যে বিগত সরকার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্বার্থে নীরব ছিল, নতুবা রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রভাবিত হয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই এটি গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিপন্থী।

রাষ্ট্রের দ্বৈত নীতি ও নাগরিকদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ: একদিকে রাষ্ট্র যোগ্য প্রার্থীদের বলে “যোগ্যতা প্রমাণ করো, তারপর চাকরি পাবে।” অন্যদিকে যোগ্যতার প্রমাণ দেওয়ার পরও যদি তাদেরকে বাদ দিয়ে অযোগ্যদের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে এটি নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু নয়। এটি এমন বিমাতাসুলভ আচরণ, যা রাষ্ট্রের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা নষ্ট করছে এবং প্রজন্মকে হতাশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

প্রয়োজন স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা: এই অনিয়মের দায় কেবল NTRCA’র নয়—বিগত সরকারেরও। সরকারি তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবেই দুর্নীতি এতদূর বিস্তার লাভ করেছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত নিবন্ধনধারীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া।

NTRCA-এর অনিয়ম কেবল শিক্ষকের নিয়োগ বঞ্চনার গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের প্রশাসনিক দুর্নীতি, আইনের প্রতি অবহেলা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি। বিগত সরকারের দায়িত্ব ছিল এই অব্যবস্থার অবসান ঘটানো, কিন্তু তারা বরং সেটিকে রক্ষা করেছে। এখন সময় এসেছে—রাষ্ট্রের প্রতি, ন্যায়বিচারের প্রতি, এবং যোগ্য শিক্ষকদের প্রতি দায় স্বীকার করার।

একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে নাগরিকদের প্রতি সুবিচার করে; অন্যথায়, রাষ্ট্রের নীতি যতই সুন্দর হোক, বাস্তবতা কলঙ্কিত থেকে যায়। শুধু শিক্ষা নয়—কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্যমূল্য, শিল্প কারখানার সংকট, পোশাক শ্রমিকের জীবনমান, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিচারব্যবস্থার অচলাবস্থা—এসব মূল সমস্যা বারবার পিছিয়ে পড়ে। আমরা ব্যস্ত হয়ে যাই ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন “ভিলেন” তৈরি করতে এবং আগের মতোই রাষ্ট্রের প্রকৃত সমস্যা পাশ কাটাতে।

বাংলাদেশের রাজনীতির এই পুনরাবৃত্তি প্রশ্ন তোলে—আমরা কি কখনো রাষ্ট্র গড়ার কাজকে গুরুত্ব দেব না? স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও কি আমরা বুঝতে পারিনি যে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠানই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে?

একটি অন্তর্বর্তী সরকার যত ভালো ইচ্ছা নিয়েই আসুক, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মূল লড়াই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে। এখনও আমরা ব্যক্তি-প্রেম ও ব্যক্তি-বিদ্বেষের রাজনীতিতে আটকে আছি। রাষ্ট্রীয় অপরাধ, দুর্নীতি ও অকার্যকরতা নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনাও আমাদের রাজনৈতিক পরিসরে ঢোকে না। এই পরিস্থিতিতে জাতির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই রাষ্ট্র নির্মাণে আগ্রহী, নাকি শুধু শাসক পরিবর্তনেই সন্তুষ্ট? রাষ্ট্রের মূল সমস্যাগুলো—দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা, বিচারহীনতা, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, শিক্ষা কাঠামো—আলোচনার বাইরে থাকলে কোনো সরকারই স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারবে না।

শেয়ার করুন