বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

খেলাপি ঋণের বোঝা ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি, ব্যাংকিং খাত চরম সংকটে

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে খেলাপি ঋণের ভয়াবহ চাপে নাজেহাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে— চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মাত্র এক বছরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট বিতরণকৃত ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা— মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে এটি রেকর্ড সর্বোচ্চ হার।

গত বছরের একই সময়ে এই অঙ্ক ছিল ২ লাখ ৮৫ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৬.৯৩ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ দেড়গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ধারণা— দীর্ঘদিন গোপন থাকা প্রকৃত খেলাপির পরিমাণ এখন কঠোর তদারকি ও বিশেষ অডিটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে।

তিন মাসে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা, যা জুনে ছিল ১৭ লাখ ৬৮ হাজার ৩৬৮ কোটি। তিন মাসে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায়— অর্থাৎ ৩৬ হাজার কোটি টাকারও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রভিশন ঘাটতিও বেড়েছে। প্রয়োজনীয় প্রভিশন ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৫৯৮ কোটি হলেও রক্ষিত প্রভিশন মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার ৩৬৬ কোটি। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৪ হাজার ২৩১ কোটি— যা জুনের তুলনায় আরও ২৪ হাজার ৫১১ কোটি বেশি।

স্থগিত সুদও বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে স্থগিত সুদ দাঁড়িয়েছে ৯৮ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা— তিন মাসে বৃদ্ধি ৫ হাজার ৩০৬ কোটি।

প্রভিশন ও স্থগিত সুদ বাদ দিয়ে নিট খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা, যা জুনের তুলনায় ২৭ হাজার ৪৩৮ কোটি বেশি। নেট এনপিএল হার ২৫.০৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৬.৪০ শতাংশ।

১৬ বছরের অনিয়ম, রাজনীতিকরণ ও পুনঃতফসিলের অপব্যবহার

বাংলাদেশ ব্যাংক জানাচ্ছে— দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও ঋণ পুনঃতফসিলের অপব্যবহার ব্যাংকিং খাতকে ভয়াবহভাবে দুর্বল করেছে। গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েকটি বড় গ্রুপ ঋণ পরিশোধে অনীহা দেখানোয় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে— খেলাপি, রাইট-অফ, পুনঃতফসিল, স্থগিত ও আদালতে আটকে থাকা ঋণ মিলিয়ে ‘ডিস্ট্রেসড অ্যাসেটস’ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামি ব্যাংকের অবস্থা

রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোতে খেলাপির চিত্র ভয়াবহ। গত জুন শেষে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৫ কোটি— যা তাদের মোট ঋণের ৪৪.৬ শতাংশ।

বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৬০ কোটি, এনপিএল হার ৩২.৯ শতাংশ। এর বড় অংশ কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কাছে কেন্দ্রীভূত, বিশেষত এস আলম ও বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে।

শরিয়াভিত্তিক ব্যাংকগুলোতেও খেলাপির অস্বাভাবিক উল্লম্ফন দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও পূর্বের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম বেশি ছিল। ইসলামী ব্যাংকের এমডি ও সিইও ওমর ফারুক খান জানান— বিদেশে থাকা সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনজীবী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ চলছে এবং আগামী এক বছরে এনপিএল ৫০ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে।

অন্যদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে খেলাপির হার মাত্র ৬.১ শতাংশ, মোট অঙ্ক ২,৯৫২ কোটি টাকা— যা সুশাসনের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা

বিআইবিএমের সাবেক মহাপরিচালক তোফিক আহমেদ চৌধুরী বলেন— দেশের ৩৫ শতাংশ ঋণ নন-পারফর্মিং হওয়া অর্থনীতির জন্য ভয়ানক সংকেত। এতে ব্যাংকের আয় কমবে, প্রভিশন বাড়বে, মূলধন দুর্বল হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নেবে না। তার মতে— ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি ছাড়া পরিস্থিতি সামাল দেওয়া অসম্ভব।

অতীতের তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়ে দেশ?

১৯৯৯ সালে খেলাপির হার ছিল ৪১.১ শতাংশ— এরপর ধারাবাহিক সংস্কারে ২০১১ সালে নেমে আসে ৬.১ শতাংশে। কিন্তু গত ১৩ বছরে আবার তা ভয়াবহভাবে বেড়ে নতুন সংকট তৈরি করেছে। যদি এখনই শক্ত পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে ব্যাংকিং খাতে আস্থাহীনতা থেকে শুরু করে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি— সবকিছুই বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে।

শেয়ার করুন