আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে রাজসাক্ষী শেখ আবজালুল হক ক্ষমা চেয়েছেন, কারণ তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় নিহত শহীদদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।
বুধবার (১৯ নভেম্বর) জবানবন্দি দেওয়ার সময় আবজালুল হক আদালতের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি সাক্ষ্য দেন ছয়জনের লাশ পোড়ানো ও সাতজনকে হত্যার ঘটনায়, যার দায়ে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে। ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বে দুই সদস্যের প্যানেল এই জবানবন্দি রেকর্ড করেন।
২৩ নম্বর সাক্ষী হিসেবে আবজালুল হক গত বছরের ৫ আগস্টের ঘটনা বিস্তারিত তুলে ধরেন। যদিও লাশ পোড়ানোর সময় তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, ১৫ আগস্ট নিজের কর্তৃক জমা দেওয়া অস্ত্র ফেরত নিতে আসার সময় জানতে পারেন যে লাশগুলো পেট্রোল দিয়ে পোড়ানো হয়েছে। তিনি জানান, আশুলিয়া থানার তৎকালীন ওসি সায়েদ ও এএসআই বিশ্বজিৎ মিলিতভাবে ছয়টি লাশ পুড়িয়েছিলেন। সাক্ষ্য শেষে ট্রাইব্যুনালের কাছে ক্ষমা চাওয়া হয়।
চলতি বছরের ২১ আগস্ট আদালত ১৬ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন। উপস্থিত আট আসামির মধ্যে সাতজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন, তবে এসআই শেখ আবজালুল হক দোষ স্বীকার করেন। তিনি রাজসাক্ষী হিসেবে মামলা সম্পর্কিত তথ্য আদালতের কাছে জানাতে চান, এবং লিখিত আবেদনের পর অনুমতি পান।
এর আগে, সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারিত থাকলেও বিশেষ পরিস্থিতির কারণে তা স্থগিত হয়। ১২ নভেম্বরও প্রসিকিউশন সাক্ষীকে হাজির করেননি। আজ সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
গত ৫ নভেম্বর ২২ নম্বর সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী শাহরিয়ার হোসেন সজিব। তার সামনে একজন নিহত হন এবং তার বন্ধু সাজ্জাদ হোসেন সজলও আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। পরে স্টেট ডিফেন্স ও আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা করেন।
৩০ অক্টোবর গুলিবিদ্ধ ভুক্তভোগী সানি মৃধা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন এবং জানান যে তিনি পুলিশের গুলিতে আহত হয়েছিলেন। ২১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি আশুলিয়ার বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দেন। ২৯ অক্টোবর আশুলিয়া থানার এসআই মো. আশরাফুল হাসান জানান, থানার ওসির নির্দেশে ১৪ এপ্রিল রাইফেলের ছয় রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয় এবং থানায় জমা দেওয়া হয়।
সাক্ষ্যগ্রহণের প্রাথমিক দিনে ১৫ সেপ্টেম্বর শহীদ আস সাবুরের ভাই রেজওয়ানুল ইসলাম এবং শহীদ সাজ্জাদ হোসেন সজলের বাবা মো. খলিলুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। তার আগের দিন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সূচনা বক্তব্য দেন।
মামলার আনুষ্ঠিক অভিযোগ ২০২৪ সালের ২ জুলাই জমা দেওয়া হয়। এতে ৩১৩ পৃষ্ঠার তথ্য, ৬২ জন সাক্ষী, ১৬৮ পৃষ্ঠার প্রমাণপত্র এবং দুটি পেনড্রাইভ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অভিযোগ গ্রহণের পর ট্রাইব্যুনাল ১৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা চালু করেন।
গ্রেফতার আসামিরা হলেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক আরাফাত হোসেন, এসআই মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, আবজাল এবং কনস্টেবল মুকুল। তবে সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ আটজন এখনও পলাতক।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আশুলিয়ায় পুলিশের গুলিতে ছয় যুবক নিহত হন। পরে পুলিশ তাদের লাশ আগুনে পুড়িয়ে দেয়। ঘটনাস্থলে একজন জীবনবঞ্চিত হলেও তাকে বাঁচানো হয়নি। পেট্রোল ঢেলে প্রাণ নেওয়া হয়। একই ঘটনায় গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা হয়।





