বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কবর খুঁড়ে বোনের কঙ্কাল কাধে নিয়ে ব্যাংকে হাজির ভাই

মো ইয়াকুব আলী তালুকদার, স্টাফ রিপোর্টার

কবর খুঁড়ে বোনের কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে ব্যাঙ্কে গেলেন দাদা, তবুও মিলল না সম্মান। ধরুন আপনার একমাত্র সঞ্চয় রাখা আছে ব্যাঙ্কে। হঠাৎ যাঁর নামে সেই অ্যাকাউন্ট, তিনি মারা গেলেন। আপনি বারবার ব্যাঙ্কে যাচ্ছেন, বোঝানোর চেষ্টা করছেন, কিন্তু কেউ শুনছে না। তখন আপনি কী করতেন? জিতু মুন্ডা নামের এক আদিবাসী মানুষ যা করলেন, তা ভারতের আমলাতান্ত্রিক ব্যর্থতার এক অসহনীয় দলিল হয়ে উঠেছে।

ঘটনাটি ভারতের ওড়িশা রাজ্যের কেওনঝড় জেলার। ওড়িশা গ্রামীণ ব্যাঙ্কের মালিপোসি শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট ছিল করলা মুন্ডার নামে। করলা ছিলেন জিতু মুন্ডার বোন। সেই অ্যাকাউন্টে জমা ছিল মাত্র ১৯ হাজার ৩০০ টাকা। গরিব আদিবাসী পরিবারের জন্য এই টাকাটুকু মোটেই সামান্য নয়, এটি তাঁদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়। গত ২৬ জানুয়ারি, ভারতের সাধারণতন্ত্র দিবসের দিনে, করলা মুন্ডা মৃত্যুবরণ করেন।

বোনের মৃত্যুর পর জিতু মুন্ডা বারবার ব্যাঙ্কে গিয়েছেন। একজন নিরক্ষর আদিবাসী মানুষ হিসেবে তিনি বাংলায় বা সরকারি ভাষায় লিখিত আবেদন করার সুযোগ পাননি, কিন্তু বারবার মুখে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন যে তাঁর বোন মারা গেছেন এবং সেই টাকাটুকু তোলা দরকার। ব্যাঙ্কের ম্যানেজার প্রতিবারই একই কথা বলেছেন, যাঁর নামে অ্যাকাউন্ট, তাঁকে সশরীরে উপস্থিত হতে হবে। নইলে টাকা মিলবে না।

জিতু বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, মৃত মানুষকে কীভাবে ব্যাঙ্কে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু ব্যাঙ্ককর্মীরা তাঁর কথায় কান দেননি। একজন গরিব, নিরক্ষর আদিবাসী মানুষের কথার কোনো মূল্য যেন সেই অফিসকক্ষে ছিল না।

অবশেষে হতাশ, তিতিবিরক্ত জিতু মুন্ডা এমন এক কাজ করলেন যা দেখে গোটা দেশ স্তব্ধ হয়ে যায়। তিনি বোনের কবর খুঁড়ে ফেললেন। করলার কঙ্কাল নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। তারপর সেই কঙ্কাল নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা ঢুকে পড়লেন ব্যাঙ্কের ভেতরে। তাঁর বক্তব্য ছিল সহজ এবং নির্মম, এই নিন, যাঁর নামে অ্যাকাউন্ট, তিনি এসেছেন। এবার টাকা দিন।

ব্যাঙ্কের ভেতরে কঙ্কাল দেখে তুমুল হইচই শুরু হয়ে গেল। পুলিশ এল। প্রশাসনের ঘুম ভাঙল। যে কাজ বারবার সাধারণভাবে কথা বলে হয়নি, একটি কঙ্কাল কাঁধে নিয়ে যেতেই সেই কাজ হয়ে গেল। অবশেষে জিতু মুন্ডা তাঁর বোনের জমানো ১৯ হাজার ৩০০ টাকা ফেরত পেলেন।

এখানে একটু থামা দরকার। ভারতীয় ব্যাঙ্কিং আইন এবং রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো আমানতকারী মারা গেলে তাঁর নমিনি বা আইনি উত্তরাধিকারী মৃত্যু সনদ এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়ে সেই টাকা তুলতে পারেন। এই প্রক্রিয়াটি জটিল হতে পারে বটে, কিন্তু সম্পূর্ণ অসম্ভব নয়। একজন সচেতন ব্যাঙ্ককর্মী বা ম্যানেজার যদি সামান্য মানবিক হতেন, তাহলে জিতুকে সঠিক পথ দেখাতে পারতেন। কিন্তু তা হয়নি। কারণ জিতু মুন্ডা গরিব, নিরক্ষর এবং আদিবাসী।

ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ইসলাম সবসময় দুর্বল, অসহায় এবং প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে। আল কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করো এবং অত্যাচারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও। নবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মজলুমের পাশে দাঁড়ায় না, সে প্রকৃত মুসলিম নয়। জিতু মুন্ডার মতো মানুষদের প্রতি যে অবহেলা এবং অমানবিকতা দেখানো হয়েছে, তা ধর্মের যেকোনো শিক্ষার বিপরীত।

মানবিক এবং সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনা একটি বৃহত্তর সমস্যার আয়না। ভারতে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই প্রান্তিক মানুষরা, বিশেষত আদিবাসী, দলিত এবং নিম্নবর্গের মানুষরা, সরকারি সেবা পেতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হেনস্থার শিকার হন। তাদের কথা শোনার মানসিকতা অনেক কর্মকর্তার মধ্যেই অনুপস্থিত। শিক্ষা, সচেতনতা এবং ক্ষমতার বৈষম্য এই সমস্যাকে আরো গভীর করে তোলে।

রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে ভাবলে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা। সেখানে একজন নিরক্ষর আদিবাসী মানুষ যদি তাঁর ন্যায্য পাওনা পেতে কবর খুঁড়তে বাধ্য হন, তাহলে সেই রাষ্ট্রের সংবিধান এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নটি উঠে আসে স্বাভাবিকভাবেই। ২৬ জানুয়ারি ভারতে সাধারণতন্ত্র দিবস। সেই একই দিনে করলা মুন্ডার মৃত্যু এবং পরবর্তী এই ঘটনাক্রম যেন ইতিহাসের এক নির্মম রসিকতা।

জিতু মুন্ডার প্রতিবাদ ছিল ভাষাহীন মানুষের একমাত্র ভাষা। সে ভাষায় ছিল না কোনো স্লোগান, ছিল না কোনো মিছিল। ছিল শুধু একটি কঙ্কাল আর একজন ভাইয়ের অব্যক্ত কান্না।

এই গল্পটি শুধু জিতু মুন্ডার নয়। এটি ভারতের লক্ষ লক্ষ প্রান্তিক মানুষের গল্প, যারা প্রতিদিন সিস্টেমের দেয়ালে মাথা ঠুকে ফিরে আসেন। আমাদের প্রশাসন, আমাদের ব্যাঙ্ক, আমাদের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সত্যিকার অর্থে মানুষের সেবায় নিয়োজিত হতো, তাহলে হয়তো একদিন কাউকে বোনের কবর খুঁড়তে হতো না।

শেয়ার করুন