বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নিজ দেশেই মুসলমান ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত, নাগেশ্বরীতে গরু জবাই বন্ধ

নিজ দেশেই মুসলমান ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত, নাগেশ্বরীতে গরু জবাই বন্ধ

মো ইয়াকুব আলী তালুকদার,

স্টাফ রিপোর্টার

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি ছোট্ট উপজেলার নাম নাগেশ্বরী। কুড়িগ্রাম জেলার এই উপজেলায় মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের তুলনায় তিনগুণ বেশি। অথচ সেই মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় আজ গরু জবাই করতে গেলে বাধা দেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এটা কি বাংলাদেশ, নাকি অন্য কোনো দেশের আইন এখানে চলছে?

ঘটনার শুরু হয় আওয়ামী লীগের শাসনামলে। সেই সময় থেকেই নাগেশ্বরীতে গরু জবাই কার্যত নিষিদ্ধ করে রাখা হয়। মানুষের প্রত্যাশা ছিল, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই অন্যায় নিয়মের অবসান হবে। কিন্তু হয়নি। জামায়াতে ইসলামীর এমপি আনোয়ারুল ইসলাম নির্বাচিত হওয়ার পরেও আওয়ামী লীগের সেই একই নিয়ম বহাল রাখা হয়েছে। শুধু বহাল রাখা নয়, দলীয় নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে গরু জবাইয়ে বাধা দিচ্ছেন।

সম্প্রতি এলাকার কিছু মুসলমান ভাই নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে ৯৬ হাজার টাকার একটি গরু কিনেছেন। উদ্দেশ্য ছিল সহজ এবং স্বাভাবিক, মুসলমানদের মধ্যে গরু জবাই করে সবাইকে খাওয়াবেন। কিন্তু এই সহজ কাজটিও করতে দেওয়া হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন এবং জামায়াতের নেতারা একজোট হয়ে এতেও বাধা দিয়েছেন।

বিষয়টি মীমাংসার জন্য একটি সভা আহ্বান করা হয়। সেই সভায় কয়েক হাজার সাধারণ মানুষ উপস্থিত ছিলেন, যাদের সিংহভাগই গরু জবাইয়ের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু বিপক্ষে ছিলেন মাত্র ৬০ থেকে ৭০ জন, যাদের মধ্যে জামায়াত, বিএনপি এবং স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোক ছিলেন। সভায় উপজেলা জামায়াতের আমির আব্দুল হামিদ বললেন, গরু না খেলে মুসলমানদের কোনো সমস্যা নেই। এমপির প্রতিনিধি আব্দুল মান্নান এবং ইউপি চেয়ারম্যান শফি মণ্ডলও একই সুরে কথা বললেন। একমাত্র হেফাজতে ইসলামের আজহারুল ইসলাম গরু জবাইয়ের পক্ষে কথা বললেন।

সভায় হাজার হাজার মানুষের রায় পরিষ্কার থাকা সত্ত্বেও প্রশাসন সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে শুরা মজলিস গঠনের কথা বলে এক সপ্তাহ সময় চেয়ে নেয়। অথচ গরু কেনা হয়ে গেছে, সময় নেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। এটি সুস্পষ্টভাবে বিষয়টিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার একটি কৌশল।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কী বলে? ইসলামে হালাল পশু জবাই করে খাওয়া শুধু বৈধ নয়, এটি একটি স্বীকৃত ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদতও বটে। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, গবাদিপশু তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে বিখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম যখন ইহুদি থেকে মুসলমান হতে চাইলেন, তখন ইহুদিরা তাকে পরীক্ষা করার জন্য উটের মাংস খেতে বললেন, কারণ ইহুদি ধর্মে উট হারাম। সেই মুহূর্তে কালিমা পড়ার পাশাপাশি উটের মাংস খেয়ে তিনি তার মুসলমান পরিচয় স্পষ্ট করলেন। কুরআনে সূরা আল-বাকারার ২০৮ নম্বর আয়াতে পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ভূখণ্ডে ইসলামের ইতিহাসের সাথেও গরুর মাংসের একটি গভীর সম্পর্ক আছে। হযরত শাহজালাল এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং তার আগমনের প্রেক্ষাপটে গরুর মাংসের বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে জড়িত। এই ভূখণ্ডে ইসলামের বিস্তার ঘটেছে এই সংস্কৃতির মধ্য দিয়েই।

বাংলাদেশের সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা আছে। একজন মুসলমান তার ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী হালাল পশু জবাই করবেন, এটি তার মৌলিক অধিকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের এলাকায় সংখ্যালঘুর অনুভূতির দোহাই দিয়ে সেই অধিকার কেড়ে নেওয়া কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে চলতে পারে না। ভারতে কোনো কোনো রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ, এটি ভারতের নিজস্ব আইন এবং সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর আবেগের প্রতিফলন। কিন্তু বাংলাদেশে সেই আইন আমদানি করার কোনো সুযোগ নেই এবং নৈতিক ভিত্তিও নেই।

যে দলটি ইসলামের নামে রাজনীতি করে, সেই দলের নেতারা যখন মুসলমানের হালাল অধিকারে বাধা দেন, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে স্বাভাবিকভাবেই। উপজেলা জামায়াতের আমির যখন বলেন, গরু না খেলে মুসলমানদের কোনো সমস্যা নেই, তখন এই বক্তব্য শুধু ভুল নয়, এটি ইসলামের মৌলিক বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক এবং চরম হিন্দুত্ববাদী মানসিকতার প্রতি তোষণকারী।

নাগেশ্বরীর এই ঘটনা আজ শুধু একটি উপজেলার বিষয় নয়। এটি একটি সংকেত। এই সংকেত উপেক্ষা করলে আগামীতে আরও বড় সমস্যা তৈরি হবে। আজ যারা চুপ থাকবেন, তারাও এই অন্যায়ের অংশীদার হবেন। সচেতন নাগরিক, আলেম সমাজ, সুশীল সমাজ এবং প্রশাসনের উচিত এখনই সঠিক অবস্থান নেওয়া এবং নাগেশ্বরীর মুসলমানদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।

শেয়ার করুন