জলিলুর রহমান জনি,সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে কারাবন্দিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে থাকা ১ হাজার ৪৮ জন বন্দির মধ্যে মাত্র ১২ জন এই সুযোগ কাজে লাগাতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। শতাংশের হিসাবে যা মাত্র ১.১৪—একেবারেই নগণ্য।
নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগকে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হলেও মাঠপর্যায়ে এর প্রভাব এখনো খুব সীমিত। কারা কর্তৃপক্ষ ও নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতার অভাব, জটিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং অনিশ্চয়তার কারণে বেশিরভাগ বন্দিই পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হননি।
ইসি সূত্রে জানা যায়, ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধন প্রক্রিয়া ১৮ নভেম্বর শুরু হয়ে ৫ জানুয়ারি রাত ১২টায় শেষ হয়। এই সময়ে সিরাজগঞ্জ জেলার মোট ৫৫ জন কারাবন্দি পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। তবে চূড়ান্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন মাত্র ১২ জন। এর মধ্যে ১১ জন সিরাজগঞ্জ জেলার এবং একজন টাঙ্গাইল জেলার ভোটার।
এই ব্যবধান থেকেই প্রশ্ন উঠছে—নিবন্ধন করেও কেন এত বড় সংখ্যক বন্দি ভোট দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক বন্দি শেষ পর্যন্ত আইনগত যোগ্যতা হারিয়েছেন, কেউ কেউ সাজাপ্রাপ্ত হওয়ায় বাদ পড়েছেন, আবার কারও কাগজপত্র যাচাই প্রক্রিয়ায় জটিলতা দেখা দিয়েছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারাধীন বন্দিদের ভোটাধিকার আইনগতভাবে স্বীকৃত। তবে বাস্তবে স্বাধীনতার পর থেকে কখনোই কারাবন্দিরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পাননি। এবার প্রথমবারের মতো নির্বাচন কমিশন সেই আইন কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কেবল বিচারাধীন বন্দিরাই ভোট দিতে পারবেন। যাদের বিরুদ্ধে আদালতে সাজা ঘোষণা হয়েছে, তারা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকবেন। ফলে কারাগারে থাকা বিপুল সংখ্যক সাজাপ্রাপ্ত বন্দি স্বাভাবিকভাবেই এই প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
কারা সূত্র জানায়, অনেক বন্দি পোস্টাল ব্যালট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাননি। আবার কেউ কেউ মনে করেছেন, ভোট দেওয়া তাদের মামলার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—যদিও বাস্তবে এর কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এছাড়া অ্যাপভিত্তিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্দিদের জন্য সহজ না হওয়ায় আগ্রহ আরও কমেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আইন ও পরিপত্র জারি করলেই যথেষ্ট নয়। কারাবন্দিদের ভোটাধিকার বাস্তবায়নে প্রয়োজন কার্যকর সচেতনতামূলক উদ্যোগ, সহজ নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং কারা প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনের আরও সমন্বয়।
নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপকে অনেকেই ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখছেন। তবে সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারের অভিজ্ঞতা বলছে, ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে বন্দিদের মধ্যে আস্থা ও আগ্রহ তৈরি করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তা না হলে আইনগত সুযোগ থাকলেও কারাবন্দিদের ভোটাধিকার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।





