মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

কক্সবাজারে আগুন: ধ্বংসস্তূপে পাওয়া দেহাবশেষে লকেট দেখে নিখোঁজ শিক্ষিকাকে শনাক্ত

দৈনিক বাংলার চোখ :

টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হলেও একজন নিখোঁজ ছিলেন।

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে নিহত ১০ জনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়ার পর নিখোঁজ স্কুল শিক্ষিকা নাসরিন আক্তার মুক্তার খোঁজে আবার উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে। মঙ্গলবার রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপের বাইরে, দ্বিতীয় তলার রেস্তোরাঁর অংশের এক কোণ থেকে একটি দেহাবশেষ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। উদ্ধার হওয়া অংশটি নাসরিনের কি-না, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে নাসরিনের গলায় থাকা লকেট দেখে সেটিকে স্ত্রীর দেহাবশেষ বলে দাবি করছেন স্বামী দেওয়ান ফয়সাল। প্রশাসনও প্রাথমিকভাবে সেই সম্ভাবনার কথা জানিয়েছে।

পরিচয় নিশ্চিত করতে ফরেনসিক পরীক্ষা ও ডিএনএ নমুনা মিলিয়ে দেখার কথা বলেছেন উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার। এর আগে নাসরিনের ডিএনএর সঙ্গে আগুনে উদ্ধার হওয়া আগের ১০টি মরদেহের নমুনার মিল পাওয়া যায়নি। ফলে ১০টি মরদেহ শনাক্ত হওয়ার পরও নিখোঁজ থাকা এই শিক্ষিকার পরিণতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল।

‘গলার লকেট দেখে ১০০ শতাংশ সন্দেহ হচ্ছে’

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দেওয়ান ফয়সাল বলেন, রিসোর্টে যাওয়ার দুই থেকে তিন দিন আগে তিনি স্ত্রীকে গলার চেইনসহ লকেটটি কিনে দিয়েছিলেন। উদ্ধার হওয়া দেহাংশে সেটি দেখে তার ধারণা হয়েছে, এটি তার স্ত্রীর।

তিনি বলেন, “আমি সাসপেক্ট ১০০%। কারণ আমার ওয়াইফের গলায় যে চেইন ছিল, লকেট ছিল, এটা আমি এই রিসোর্টে আসার দুই থেকে তিন দিন আগে ওকে কিনে দিয়েছি, ওই লকেটটা ওর গলায় আছে।”তবে স্বামীর এই ধারণা এখনো আনুষ্ঠানিক শনাক্তকরণ নয়। উদ্ধার হওয়া দেহাংশের পরিচয় নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন।

নাসরিন ঢাকার উপকণ্ঠ সাভারের আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। দুই বান্ধবীর সঙ্গে ছুটি কাটাতে কক্সবাজারে এসেছিলেন তিনি। তার স্বামী দেওয়ান ফয়সাল ঢাকা জেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাবেক নেতা। ফয়সাল বলেন, নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি উখিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গিয়েছিলেন। তখন তাকে বলা হয়েছিল, মরদেহ পাওয়া গেলে জিডি নেওয়ার প্রক্রিয়া কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পরে তিনি ঘটনাস্থলে প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের কর্মকর্তাদের উদ্ধারকাজ চালাতে দেখেন।

উদ্ধারকাজে যুক্ত ব্যক্তিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফয়সাল বলেন, অগ্নিকাণ্ডে তার স্ত্রীর মৃত্যু হয়ে থাকলে সেটি একটি অস্বাভাবিক মৃত্যু। এ ঘটনায় কারও হাত আছে কি-না, সে বিষয়ে তিনি কোনো অভিযোগ করেননি।

যেভাবে পাওয়া গেল দেহাংশ

উখিয়ার ইউএনও পান্না আক্তার বলেন, নাসরিনের স্বজনেরা রিসোর্টের দ্বিতীয় তলার যে কক্ষে উঠেছিলেন, তার বিপরীত দিকের একটি জায়গা দেখিয়ে সেখানে তল্লাশি চালানোর অনুরোধ করেন। মঙ্গলবার ফায়ার সার্ভিসের একটি দল আবার উদ্ধার অভিযানে গেলে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে জানান তিনি। ইউএনওর ভাষ্য, স্বজনের দেখানো জায়গাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তল্লাশি চালানোর একপর্যায়ে দেহাংশটি পাওয়া যায়। তার ধারণা, আগুনের সময় ওই অংশে তীব্র তাপ ও ভবনের কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে পড়ায় আগে সেখানে তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, উদ্ধার হওয়া দেহাংশটি খুব বেশি পুড়ে গেছে। সেখানে মাথার খুলি, দাঁত ও শরীরের কাঠামোর কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল। গলায় সোনার চেইনও ছিল বলে জানান তিনি। ইউএনও বলেন, মুক্তার স্বামী ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং চেইন, কক্ষের অবস্থান ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে সেটি তার স্ত্রীর দেহাবশেষ বলে দাবি করছেন। তবে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ফরেনসিক পরীক্ষা করা হবে। মুক্তার বাবা-মায়ের ডিএনএ নমুনা আগেই সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়েছিল; উদ্ধার হওয়া দেহাংশ থেকে নমুনা নিয়ে তা মিলিয়ে দেখার কথা বলেছেন ইউএনও।

‘আগের ১০ মরদেহের বাইরে’ দেহাংশ

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য বলেন, আগে উদ্ধার করা ১০টি মরদেহের জায়গা থেকে আলাদা স্থানে দেহাংশটি পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, দেহাংশটি ভবনের কাঠামোর বাইরে, রেস্তোরাঁর এক কোণে পড়ে ছিল। ধ্বংসস্তূপের বড় অংশের নিচে জায়গাটি ঢাকা থাকায় আগে সেটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দোলন আচার্য্য বলেন, তবে এটি নতুন কোনো ব্যক্তির দেহাংশ, নাকি আগের ১০টি মরদেহের কারও দেহের অংশ, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে। এ কারণে দেহাংশটি পাওয়া গেলেই নিখোঁজের তালিকায় থাকা ১১তম ব্যক্তির সন্ধান মিলেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। পরীক্ষার ফলই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন