সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল: রোগ সারানোর দাবি কতটা সত্য?

দৈনিক বাংলার চোখ :

শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা সারে, তক্ষক খেলে বাড়ে যৌনক্ষমতা, আর জোঁকের তেলে দূর হয় জয়েন্ট ও কোমরব্যথা। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত এসব লোকবিশ্বাসের পেছনে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং এসব ধারণাকে কেন্দ্র করে বন্যপ্রাণী হত্যা, পাচার ও প্রতারণার ঘটনা ঘটছে।

শিয়ালের মাংসে কি রোগ সারে?

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় শিয়ালকে অশুভ বা ক্ষতিকর প্রাণী মনে করার পাশাপাশি এর মাংসের ঔষধি গুণ রয়েছে বলেও বিশ্বাস করা হয়। অনেকে মনে করেন, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি, বাতসহ দীর্ঘস্থায়ী বিভিন্ন রোগ ভালো হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. মনিরুল এইচ খান বলেন, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ নেই। এটি খেলে অসুখ ভালো হয়, এমন ধারণা ভ্রান্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতও জানান, শিয়ালের মাংস খেলে রোগ সারে, এমন দাবির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। রাতের বেলা শিয়ালের ডাককে অমঙ্গলের লক্ষণ মনে করারও কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

তক্ষক নিয়ে কোটি টাকার গুজব

তক্ষককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে কোটি টাকায় বিক্রির নানা গল্প ও প্রতারণার ঘটনা শোনা যায়। ক্যানসারসহ দুরারোগ্য রোগ সারানো কিংবা যৌনক্ষমতা বাড়ানোর কথিত ঔষধি গুণের কথা বলে এর দাম কয়েক কোটি টাকা দাবি করা হয়। তবে এসব দাবির নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে তক্ষকের চাহিদা রয়েছে, এমন বিশ্বাসের কারণে চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামসহ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ প্রাণী পাচার হয়েছে। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে বাংলাদেশে তক্ষকের সংখ্যা কমেছে।

জোঁকের তেল আর লিচ থেরাপি কি এক?

চিকিৎসায় নির্দিষ্ট ধরনের জোঁক ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে মেডিকেটেড জোঁক দিয়ে লিচ থেরাপি দেওয়া হয়। তবে সব জোঁক এ কাজে ব্যবহারযোগ্য নয়।

হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ জানান, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রক্ত জমাট বাঁধার সমস্যা ও কিছু ক্ষতের চিকিৎসায় লিচ থেরাপি ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে, জোঁকের তেল দিয়ে বাত, কোমরব্যথা ও যৌনসমস্যা সারানোর দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত।

আইনে কী আছে?

বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী শিয়াল ও তক্ষক সংরক্ষিত প্রাণী। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া এসব প্রাণী শিকার, পরিবহন ও কেনাবেচা আইনবিরুদ্ধ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শিয়ালের মাংস বা তক্ষক খেয়ে রোগ সারানোর ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। এসব প্রাণী কাঁচা খেলে অজানা জীবাণু বা ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিও রয়েছে। তাই লোকবিশ্বাসের ওপর নির্ভর না করে অসুস্থ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সচেতন হওয়া জরুরি।

শেয়ার করুন