সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬: গ্রুপ জি প্রিভিউ

বেলজিয়াম, মিশর, ইরান ও নিউজিল্যান্ড— এই চার দল আছে বিশ্বকাপের জি গ্রুপে। এখান থেকে ইতিহাসের দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছে তিনটি দল।

এই গ্রুপের সব দলের সূচি, শক্তিসামর্থ্য, দুর্বলতা, চ্যালেঞ্জগুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাক—

গ্রুপ জি ফিক্সচার
১৫ জুন, ইরান-নিউজিল্যান্ড, লস অ্যাঞ্জেলেস
১৫ জুন, বেলজিয়াম-মিশর, সিয়াটল
২১ জুন, বেলজিয়াম-ইরান, লস অ্যাঞ্জেলেস
২১ জুন, নিউজিল্যান্ড-মিশর, ভ্যাংকুভার
২৬ জুন, মিশর-ইরান, সিয়াটল এবং
২৬ জুন, নিউজিল্যান্ড-বেলজিয়াম, ভ্যাংকুভার

দল প্রিভিউ— বেলজিয়াম
বেলজিয়াম এই গেল ২০১৮ বিশ্বকাপেও অন্যতম ফেভারিট ছিল। তবে কালের বিবর্তনে সেই ফেভারিট তকমা এখন আর নেই। দলটির সোনালি প্রজন্মের সিংহভাগ বিদায় নিয়েছেন খালি হাতে।

২০২৬ বিশ্বকাপে বেলজিয়াম এসেছে নতুন রূপে। পুরোনো তারকাদের সাথে নতুন তরুণ খেলোয়াড়দের মিশেলে রোমাঞ্চকর এক দলই তৈরি হয়েছে।

কোচ রুডি গার্সিয়া ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি দলে নতুন প্রাণ ও কৌশলগত বৈচিত্র্য এনেছেন।

বেলজিয়াম ফিফা র‍্যাংকিংয়ে বরাবরই ওপরের দিকে থাকে। বিশ্বকাপের ফেভারিট না হলেও জি গ্রুপে তারাই সবচেয়ে বড় ফেভারিট। ২০২৬ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তাদের ৫-২ গোলের জয়, বা সবশেষ ম্যাচে তিউনিসিয়াকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়া বলে দিচ্ছে, দলের শক্তিসামর্থ্য নেহায়েত কম নয়।

আক্রমণ
বেলজিয়ামের আক্রমণ সত্যিই ভয়ঙ্কর। জেরেমি ডকু বাম দিক থেকে যেভাবে আক্রমণ করেন, তা প্রতিপক্ষের জন্য রীতিমতো দুঃস্বপ্ন। তার গতি এবং ওয়ান অন ওয়ান পরিস্থিতিতে  দক্ষতা বিশ্বমানের। বাছাইপর্বে তিনি পাঁচটি গোল ও দুটি অ্যাসিস্ট করেছেন।

৩৪ বছর বয়সী কেভিন ডি ব্রুইনা এখনও দলের প্রধান সৃষ্টিশীল শক্তি। তিনি এমন সব পাস বের করতে পারেন যা অন্য কেউ কল্পনাও করতে পারে না। সেট পিস থেকেও তিনি গোলের বড় উৎস বেলজিয়ামের।

রমেলু লুকাকু বেলজিয়ামের সর্বকালের সেরা গোলদাতা। প্রতিপক্ষ ভেদে তিনি কিংবা চার্লস ডি কেতেলার মূল স্ট্রাইকার হিসেবে খেলবেন।

লোইস ওপেন্ডার হাইপ্রেসিং দারুণ কার্যকর। কোচ যদি হাইপ্রেস করার কৌশল বেছে নেন, তাহলে ওপেন্ডা হবেন ট্রাম্পকার্ড।

পাল্টা আক্রমণে বেলজিয়াম সবচেয়ে বিপজ্জনক। ডকু দলের আক্রমণকে বিস্তৃতি দেন, সঙ্গে ডি ব্রুইনার পাসিং রেঞ্জ যোগ হলে তা যে কোনো রক্ষণকে বিপর্যস্ত করে দিতে পারে। দলের আক্রমণ এতটাই গভীর যে কয়েকজন খেলোয়াড় ২০২৬ বিশ্বকাপের সেরা গোলদাতার দৌড়ে থাকবেন বলে মনে করা হচ্ছে।

মিডফিল্ড
বেলজিয়ামের মিডফিল্ড অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়। আমাদৌ ওনানা ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে থেকে পুরো দলকে রক্ষণে সহায়তা করেন। তার উপস্থিতি পুরো রক্ষণব্যূহকে শক্ত করে। ইউরি তিয়েলেমান্স ওনানার পাশে খেলেন এবং আক্রমণ-রক্ষণ দুটোতেই ভারসাম্য রাখেন। লেয়ান্দ্রো ত্রোসার্ড মিডফিল্ড বা উইং থেকে খেলেন এবং গোলে সরাসরি অবদান রাখতে পারেন। ডি ব্রুইনা সামান্য এগিয়ে থেকে মিডফিল্ড নিয়ন্ত্রণ করেন। এটাই তার সবচেয়ে কার্যকর অবস্থান।

কোচ গার্সিয়া প্রতিপক্ষ অনুযায়ী ৪-৩-৩ ও ৪-২-৩-১ ছকের মধ্যে সহজে সুইচ করতে পারেন। এই নমনীয়তা বেলজিয়ামের বড় শক্তি।

রক্ষণ
বেলজিয়ামের রক্ষণ এই দলের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। আর্তুর তিয়াত, ক্যোন দেবাস্ত ও কনি ডি উইন্টারকে আপনি চেনেন? না! ফলে বিষয়টা পরিষ্কার, তাদের নিয়ে গড়া নতুন রক্ষণলাইন এখনও অনভিজ্ঞ অনেকটাই। তাদের ওপর টুর্নামেন্টের চাপে নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।

থিবো কোর্তোয়া বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলকিপার। তার উপস্থিতি রক্ষণের অনেক ভুল একাই ঢেকে দিতে পারে। তবে ফুলব্যাকরা যখন ওপরে উঠে যান, তখন পিছনে জায়গা তৈরি হয়। প্রতিপক্ষের দ্রুত ফরোয়ার্ডরা সেই সুযোগ নিতে পারে।

বাছাইপর্বে এগিয়ে থাকার পর লিড ধরে রাখতে না পারার প্রবণতা ছিল। এই টুর্নামেন্টে সেটা ঠিক না করলে বিপদ হতে পারে।

ওনানা রক্ষণকে অনেকটা সামলান, কিন্তু সংগঠিত আক্রমণের বিরুদ্ধে সেন্টারব্যাকদের আরও নির্ভরযোগ্য হতে হবে।

সম্ভাব্য একাদশ
কোর্তোয়া; মিউনিয়ের, ডি উইন্টার, তিয়াত ও ডি কুইপার; ওনানা, তিয়েলেমান্স, ত্রোসার্ড, ডি ব্রুইনা ও ডকু; ডি কেতেলারে

সেট পিস
কর্নার: ডি ব্রুইনা, তিয়েলেমান্স ও ত্রোসার্ড।
ডিরেক্ট ফ্রি কিক: ডি ব্রুইনা ও ডকু।
পেনাল্টির: ডি ব্রুইনা, তিয়েলেমান্স ও লুকাকুর।

চ্যালেঞ্জ
বেলজিয়ামের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জ আছে। লুকাকু ও ডি ব্রুইনার ফিটনেস তিনটি ম্যাচ জুড়ে ঠিক রাখা খুব জরুরি। তিনটি ম্যাচে তারা যদি ফিট না থাকেন, পুরো দলের ছন্দ নষ্ট হবে।

ফুলব্যাক ওপরে উঠলে রক্ষণে বেশ ফাকা জায়গা তৈরি হয়। এই দুর্বলতা সামলাতে মিডফিল্ডকে আরও পরিশ্রম করতে হবে।

বাছাইপর্বে লিড হারানোর যে প্রবণতা দেখা গেছে, সেটা বিশ্বকাপে মোটেই চলবে না। ইরান ও মিশরের মতো দল সুযোগ পেলে ছাড়বে না।

তরুণ রক্ষকদের মানসিক দৃঢ়তা পরীক্ষা হবে বড় মঞ্চে প্রথমবার খেলতে নেমে। আন্তর্জাতিক চাপ সামলানো শিখতে হবে দ্রুত। আক্রমণে মূল তারকারা না থাকলেও দলকে সমান ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে।

দল প্রিভিউ– মিশর

মিশর ২০১৮ সালের পর এবার চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে। কোচ হোসাম হাসান মিশরের সর্বকালের সেরা গোলদাতা হিসেবে ৬৯টি আন্তর্জাতিক গোল করেছেন। তিনি ১৯৯০ সালে খেলোয়াড় হিসেবে এবং এবার কোচ হিসেবে মিশরকে বিশ্বকাপে নিয়ে গেছেন। বাছাইপর্বে মিশর ১০ ম্যাচে অপরাজিত ছিল।

মাত্র দুটি গোল খেয়ে তারা বুরকিনা ফাসোর চেয়ে পাঁচ পয়েন্ট এগিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এই দলের ভিত্তি শক্ত রক্ষণ ও মোহামেদ সালাহ-ওমর মারমুশের মতো বিপজ্জনক অ্যাটাকারদের ওপর। ২০২৬ বিশ্বকাপ মিশরের জন্য ইতিহাস বদলানোর সুযোগ কারণ তারা এখনও কোনো বিশ্বকাপ ম্যাচ জেতেনি।

আক্রমণ
মোহামেদ সালাহ এই দলের সবকিছুর কেন্দ্রে। ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বাছাইপর্বে ৯টি গোল করেছেন এবং মোট ৬৭টি আন্তর্জাতিক গোলের মালিক। এই বিশ্বকাপ তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অধ্যায় হয়ে যেতে পারে।

ওমর মারমুশ ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে খেলেন এবং সালাহর পাশে দুর্দান্ত জুটি গড়েছেন। তার সৃষ্টিশীলতা, প্রেসের তীব্রতা ও ন্যারো স্পেসে গোল করার ক্ষমতা অসাধারণ।

ত্রেজেগে অতিরিক্ত অ্যাটাকার অপশন হিসেবে আছেন। টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতা ও দুই সংখ্যার আন্তর্জাতিক গোলের রেকর্ড তাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। রক্ষণকে টেনে-প্রশস্ত করতে সরাসরি উইং দৌড় ব্যবহার করা হয়। এরপর সালাহ ও মারমুশকে সেরা পজিশনে বল দেওয়া হয়। যখন সালাহ ও মারমুশ একসাথে ফর্মে থাকেন, তখন মিশর এই গ্রুপে যেকোনো দলকে কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। কোচ হাসানের কাছে বেঞ্চ থেকেও ভালো অপশন আছে যা আক্রমণের টেম্পো বদলাতে পারে।

মিডফিল্ড
মিশরের মিডফিল্ড কঠোর পরিশ্রমী এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ। তারা মূলত রক্ষণাত্মক কাজে মনোযোগ দেন এবং সালাহ-মারমুশকে সেরা পরিস্থিতিতে বল সরবরাহ করেন। মিডফিল্ডাররা ন্যারো স্পেসে থেকে সেন্ট্রাল জায়গা ডিফেন্ড করেন। যার ফলে প্রতিপক্ষ ওয়াইড এরিয়া থেকে আক্রমণে উঠতে বাধ্য হয়। বাছাইপর্বে মিশরের মিডফিল্ড প্রতিপক্ষকে সুযোগ দেয়নি বললেই চলে। সাতটি ক্লিনশিট তাদের মাঝমাঠের কার্যকারিতার প্রমাণ।

সুযোগ দেখলেই মিডফিল্ড থেকে দ্রুত থ্রু পাস আসে সালাহর কাছে, এটাই মিশরের গেমপ্ল্যানের মূল সুতো। ফাতহি ও আশুর মিডফিল্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং পুরো দলের ভারসাম্য বজায় রাখেন।

রক্ষণ
মিশরের রক্ষণ বাছাইপর্বে অসাধারণ ছিল। ১০ ম্যাচে মাত্র দুটি গোল খেয়েছে এবং সাতটি ক্লিনশিট করেছে। ইয়াসের আহমেদ ইব্রাহিম এল হানাফি ও মোহামেদ আবদেলমোনেম সেন্টারব্যাক পজিশনে বেশ অভিজ্ঞ।

ফুলব্যাকরা সুচিন্তিতভাবে ওপরে ওঠেন, নির্বিচারে নয়। এই শৃঙ্খলা তাদের রক্ষণভাগকে টেকসই করে তোলে। দল দীর্ঘসময় রক্ষণে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

সম্ভাব্য একাদশ
শোবেইর; হানি, এল হানাফি, আবদেলমোনেম ও এল ফেতুহ; আত্তিয়া ও ফাতহি; সালাহ, আশুর ও ত্রেজেগে; মারমুশ।

সেটপিস তথ্য
কর্নার-সালাহ, মারমুশ ও জিজো।
ফ্রিকিক-মোহামেদ সালাহ।
পেনাল্টি-সালাহ।

চ্যালেঞ্জ
মিশরের সামনে কিছু সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ আছে। সালাহ ও মারমুশ ছাড়া আক্রমণ অনেক নির্ভরযোগ্য নয়। যদি এই দুজনের কেউ ফর্মে না থাকেন বা আহত হন, পুরো আক্রমণ ভোঁতা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ক্যাফ বাছাইপর্বে যে রক্ষণ কাজ করেছে, ইউরোপীয় বা দক্ষিণ আমেরিকান দলের বিরুদ্ধে একই কৌশল কতটা কার্যকর হবে সেটা অনিশ্চিত।

সুযোগ কাজে লাগানো মিশরের বড় সমস্যা। তারা এখনও বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ জেতেনি। এই রেকর্ড বদলাতে হলে সুযোগ নষ্ট করা চলবে না।

ইউরোপীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান দলের টেকনিক্যাল শ্রেষ্ঠত্বের মুখোমুখি হওয়া বড় পরীক্ষা দলটির জন্য। বাছাইপর্বের মান থেকে বিশ্বকাপের মানে ওঠার এই ধাপটা পেরোনো সহজ নয়।

সালাহ ৩৪ বছর বয়সী এবং সম্ভবত এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ঝুঁকি তৈরি করবে বৈকি।

টিম প্রিভিউ– ইরান
ইরান টানা চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে। এশিয়ার অন্যতম অভিজ্ঞ দল হিসেবে তারা এখন পরিচিত। কোচ আমির ঘালেনোই একজন বাস্তববাদী ট্যাকটিশিয়ান। বাছাইপর্বে ইরান ১৬টি এএফসি ম্যাচে মাত্র একটিতে হেরেছে এবং তৃতীয় স্থানে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাতের চেয়ে আট পয়েন্ট এগিয়ে গ্রুপ শেষ করেছে।

ফিফা র‍্যাংকিংয়ে তারা শীর্ষ ২৫-এ আছে। তবে এই দলকে ঘিরে বেশ কিছু বিতর্ক ও রাজনৈতিক জটিলতা আছে। সার্দার আজমুন প্রাথমিক ৩০ জনের দলে না থাকায় বড় আলোচনা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মিডিয়া বলছে ইনজুরির কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক কারণেও বের করে দেওয়া হয়েছে বলে রিপোর্ট আছে।

বিশ্বকাপের আগে ইরানের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রেক্ষাপটে তাদের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ নিয়েই প্রশ্ন উঠেছিল।

আক্রমণ
আজমুনের অনুপস্থিতিতে ইরানের আক্রমণ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মেহদি তারেমি এখন দলের একমাত্র নির্ভরযোগ্য অ্যাটাকার। তারেমি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ৫৬টি গোল করেছেন এবং পোর্তো, ইন্টার মিলান ও বর্তমানে অলিম্পিয়াকোসের হয়ে ইউরোপে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। বাছাইপর্বে তিনি ১৫ ম্যাচে ১০টি গোল করেছেন।

সামান ঘোদ্দোস মধ্যমাঠ থেকে আক্রমণে সংযোগ তৈরির প্রধান দায়িত্ব নিয়েছেন। আজমুনের বাদ পড়ার পর তার গুরুত্ব দশগুণ বেড়েছে। মেহদি ঘায়েদি ও আমিরহোসেইন হোসেইনজাদে উইংয়ে খেলেন, তারেমির জন্য বক্সে জায়গা তৈরি করেন।

ইরানের আক্রমণ দ্রুত পাল্টা আক্রমণের ওপর নির্ভর করে। আজমুন ছাড়া দ্বিতীয় গোলের হুমকি নেই বললেই চলে এবং তারেমির ওপর চাপ এখন যেকোনো পূর্ববর্তী টুর্নামেন্টের চেয়ে বেশি।

মিডফিল্ড
সাইদ এজাতোলাহি মিডফিল্ডের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে তার উপস্থিতি ব্যাকলাইনকে বাড়তি সুরক্ষা দেয়। তার অনুপস্থিতিতে পুরো সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে।

ট্রানজিশনে ঘোদ্দোস ও মোহাম্মদ মোহেবি বেশ কার্যকর। কোচ ঘালেনোইর পদ্ধতি ৪-৩-৩ বা ৪-২-৩-১ — দুটোই হতে পারে, কিন্তু মূল মনোযোগটা সবসময় রক্ষণই হয়ে থাকে।

ঘোদ্দোস এখন ক্রিয়েটিভ ভার বহন করছেন যা মূলত দলের পরিকল্পনায় তার জন্য ছিল না। এটা তার জন্য বড় পরীক্ষা। মিডফিল্ড থেকে দ্রুত বল বের করে তারেমির পায়ে পাঠানো ইরানের খেলার প্রধান বৈশিষ্ট্য।

রক্ষণ
ইরানের রক্ষণ অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। বাছাইপর্বের দলের গড় বয়স ৩০ বছরের বেশি, যা এই টুর্নামেন্টের অন্যতম বয়স্ক দল। শোজা খালিলজাদে ও আলি নেমাতি কেন্দ্রে খেলেন। খালিলজাদে অভিজ্ঞতা দিয়ে পুরো রক্ষণকে সুসংগঠিত রাখেন।

আরিয়া ইউসুফি ও মিলাদ মোহাম্মাদি ফুলব্যাক হিসেবে খেলেন। আলিরেজা বেইরানভান্দ গোলে ৮০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও ২টি বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতা নিয়ে এই বিশ্বকাপে এসেছেন। দলটি রক্ষণাত্মক কৌশলে বেশ শক্তিশালী, কিন্তু প্রথমে গোল খেয়ে বসলে পুরো কৌশল উলটে যায়।

সম্ভাব্য একাদশ
বেইরানভান্দ; ইউসুফি, নেমাতি, খালিলজাদে ও মোহাম্মাদি; এজাতোলাহি, ঘোদ্দোস ও মোহেবি; ঘায়েদি, তারেমি ও হোসেইনজাদে।

সেটপিস
কর্নার-ঘোদ্দোস, হোসেইনজাদে, ওমিদ নুরাফকান ও ঘায়েদি।

ফ্রিকিক-তারেমি ও ঘোদ্দোস।

পেনাল্টি-তারেমি ও হোসেইনজাদে।

চ্যালেঞ্জ
ইরানের সামনে বেশ কঠিন চ্যালেঞ্জ আছে। আজমুনের অনুপস্থিতি ঢেকে দিতে হলে ঘোদ্দোসকে নতুন সৃষ্টিশীল ভূমিকায় ভালো করতে হবে। পুরনো ছকে শুধু তারেমিকেই প্রধান ভরসা হিসেবে খেলার কৌশল আর কাজ নাও করতে পারে।

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ইরান তিনটি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কখনও নকআউটে যায়নি। এবার সুযোগ আছে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও কূটনৈতিক জটিলতা মাঠের বাইরে মনোযোগ হারানোর কারণ হতে পারে। কোনো অন্য দলকে এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে না।

মার্চের প্রীতি ম্যাচে আক্রমণের গভীরতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, বিশ্বকাপে তা আরও স্পষ্ট হয়ে পড়বে। বেলজিয়াম বা মিশরের কাছে প্রথম গোল খেলে দলটি পুরোপুরি অন্য সিস্টেমে খেলতে বাধ্য হবে যা তাদের জন্য স্বাভাবিক নয়। ফলে শুরুতেই যেন গোল হজম করে না বসে, সে দিকে নজর দিতে হবে।

টিম প্রিভিউ– নিউজিল্যান্ড
নিউজিল্যান্ড ২০১০ সালের পর আবার বিশ্বকাপে ফিরেছে। ১৬ বছরের অনুপস্থিতির পর এই ফিরে আসা দেশজুড়ে উৎসবের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওএফসি বাছাইপর্বে তাদের পারফরম্যান্স ছিল দুর্দান্ত। পাঁচটি ম্যাচেই জিতেছে এবং মাত্র একটি গোল খেয়েছে। ফিজিকে ৭-০ এবং নিউ ক্যালেডোনিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে।

কোচ ড্যারেন বাজলি ২০২৩ সাল থেকে দায়িত্বে আছেন এবং দলে স্থিতিশীলতা ও স্পষ্ট পরিচয় এনেছেন। ২০১০ সালের দলটি তিনটি ম্যাচেই ড্র করেছিল, এমনকি বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইতালিকেও রুখে দিয়েছিল। সেবারের বিশ্বকাপের একমাত্র অপরাজিত দল ছিল এই অল হোয়াইটসরা।

এবারের দলও সেই প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে মাঠে নামবে। ক্রিস উডের নেতৃত্বে নিউজিল্যান্ড যেকোনো দলের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম।

আক্রমণ
ক্রিস উড এই দলের আক্রমণে প্রধান মুখ। নটিংহাম ফরেস্টের হয়ে ২০২৪-২৫ প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে ২০টি গোল করেছেন। তিনি এখন নিজের সেরা ফর্মে আছেন।

ইলাইজা হেনরি জাস্ট দলে প্রাণশক্তি ও গোলের সুযোগ নিয়ে আসেন। মার্চে চিলির বিরুদ্ধে ৪-১ জয়ে তার গোলটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মার্কো স্তামেনিচ, সারপ্রিত সিং ও মিডফিল্ড ইউনিট সেকেন্ড বল দখলের লড়াইয়ে ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং দ্রুত উডকে সার্ভিস দেন। বেঞ্জামিন ওল্ড বাম পাশ থেকে আক্রমণকে বিস্তৃতি এনে দেন। নিউজিল্যান্ডের আক্রমণ সহজ কিন্তু কার্যকর। বল পেলেই তা যাবে উডের দিকে, সেটাই তাদের পরিকল্পনা। তবে গেল মার্চে উড ছাড়াই চিলিকে ৪-১ গোলে হারানো দেখিয়েছে এই দলে সত্যিকারের আক্রমণের গভীরতা আছে।

মিডফিল্ড
স্তামেনিচ ও বেল কেন্দ্রীয় মিডফিল্ডে তাদের বাজির ঘোড়া। তারা শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং বল জেতার লড়াইয়ে দারুণ। নিউজিল্যান্ডের মিডফিল্ড প্রথমে বল জেতে, তারপর যত দ্রুত সম্ভব অ্যাটাকারদের কাছে পাঠায়। সারপ্রিত সিং মাঝমাঠে সৃষ্টিশীলতার ছোঁয়া আনেন। তিনি ম্যাথিউ গারবেটের সঙ্গে দলে জায়গা করে নেওয়ার দৌড়ে আছেন।

রক্ষণ
টাইলার বিন্ডন শেফিল্ড ইউনাইটেডে লোনে খেলছেন নটিংহাম ফরেস্ট থেকে। তিনি দলের সবচেয়ে প্রতিভাবান ডিফেন্ডার। বেঞ্জামিন ওল্ড বা বিল টুইলোমা লেফট ফুলব্যাক হিসেবে খেলেন, আক্রমণে বাড়তি সুযোগ সৃষ্টিতে তার জুড়ি মেলা ভার, পাশাপাশি রক্ষণে শৃঙ্খলা বজায় রাখেন।

ম্যাক্সিম টেরেমোয়ানা ক্রোকম্বে গোলে মিলওয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে নিয়মিত খেলছেন এবং ভালো ফর্মে আছেন।

মার্চে ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেট পিসে হজম করা গোলটি বড় দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। বেলজিয়াম বা মিশরের মতো দলের বিরুদ্ধে এই ভুল পুনরাবৃত্তি হলে বিপর্যয় হবে।

সম্ভাব্য একাদশ
ক্রোকম্বে; কাকাচে, বক্সল, বিন্ডন ও ওল্ড; স্তামেনিচ ও বেল; জাস্ট, গারবেট ও সিং; সামনে উড।

চ্যালেঞ্জ
নিউজিল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বেলজিয়াম ও মিশরের মতো দলের বিরুদ্ধে ৯০ মিনিট কাঠামো ধরে রাখা।

সেট পিসে দুর্বলতা অবশ্যই সারাতে হবে। ফিনল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম গোলটি এই দুর্বলতাই দেখিয়েছিল।

ইরানের বিরুদ্ধে ম্যাচকেই পাখির চোখ করতে হবে কিউইদেরকে। সেখানে হারলে নকআউটের সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।

উড ছাড়া দল ছন্দে আসে না — এটা এখনও সত্য। তার ফিটনেস নিশ্চিত রাখা বাজলির সবচেয়ে বড় কাজ।

ক্রোকম্বে সম্প্রতি ভালো ফর্মে থাকলেও বেলজিয়ামের আক্রমণের মতো চাপ সামলানো তার জন্য নতুন অভিজ্ঞতা হবে।

প্রেডিকশন
বেলজিয়াম এই গ্রুপ থেকে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার প্রবল দাবিদার। দ্বিতীয় স্থানের লড়াই মিশর ও ইরানের মধ্যে। মিশর সালাহ-মারমুশ জুটির কারণে ফেভারিট। কিন্তু ইরানের রক্ষণের দৃঢ়তা ও তারেমির গোলের ক্ষুধা দলটিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তোলে। ২৬ জুনের মিশর-ইরান ম্যাচটিই এই গ্রুপের ভাগ্য নির্ধারণ করবে।

নিউজিল্যান্ডের সুযোগ কম, কিন্তু অসম্ভব নয়। ইরানের বিরুদ্ধে ড্র বা জয় পেলে এবং বেলজিয়াম ও মিশরের বিরুদ্ধে গোল ব্যবধান নিয়ন্ত্রণে রাখলে চমক হতে পারে।

শেয়ার করুন