শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বিশ্বকাপের রঙে উন্মাদনা

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই দারুণ এক উৎসব। বিশ্বের নানা প্রান্তের মতো বাংলাদেশেও এ উৎসব ছড়িয়ে পড়ে পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে শহরের অলিগলি পর্যন্ত। বিশ্বকাপের দিনগুলোতে দেশের আকাশে উড়তে থাকে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স কিংবা স্পেনের পতাকা। কোথাও সমর্থকরা তৈরি করেন বিশাল গেট, কোথাও বের হয় বিশাল শোভাযাত্রা, আবার কোথাও বাড়ির দেওয়াল রাঙানো হয় প্রিয় দলের রঙে। তবে এরই মধ্যে এ উৎসবের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো ফুটবল জার্সি।

বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় জমে উঠেছে জার্সির বাজার। ঢাকার গুলিস্তানের স্টেডিয়ামপাড়া, নিউমার্কেট, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের প্রায় সব শহরেই দেখা যায় রঙিন জার্সির সমাহার। ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় শপিংমল-সবখানেই এখন ফুটবল জ্বরের ছাপ। গুলিস্তানের একটি দোকানে ঢুকেই ১০ বছরের রায়হান বাবার হাত টেনে বলল, ‘বাবা, মেসির ১০ নম্বর জার্সিটা নেব।’ দোকানদার হাসতে হাসতে একটি আকাশি-সাদা জার্সি নামিয়ে দিলেন। বললেন, ‘ভালো কাপড়, দাম ৪৫০ টাকা।’ রায়হানের মুখে তখন বিজয়ের হাসি। জার্সি গায়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন ছোট্ট মেসি ভাবতে শুরু করেছে। অন্য এক দোকানে দেখা গেল আট বছরের সামিয়াকে। সে মায়ের সঙ্গে এসেছে ব্রাজিলের জার্সি কিনতে। ‘আমি ভিনিসিয়ুসের জার্সি চাই,’ মেয়েটির আবদার। দোকানদার কয়েকটি জার্সি দেখিয়ে বললেন, ‘শিশুদের জার্সি ২৫০ টাকা থেকে শুরু।’

মা-মেয়ের হাসিমুখ দেখে বোঝা যায়, বিশ্বকাপের আনন্দ কেবল মাঠেই সীমাবদ্ধ নয়; তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবারেও। বিশ্বকাপ সামনে রেখে ফুটপাতের দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় স্বল্পমূল্যের জার্সি। সাধারণত ২০০ থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায় এসব জার্সি। একটু উন্নত জার্সির দাম ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। অনেক ফ্যাশন ব্র্যান্ডও বিশ্বকাপকে ঘিরে বাজারে এনেছে নানা ধরনের ফুটবল জার্সি ও সমর্থকদের পোশাক। ফলে ফুটপাত থেকে শোরুম-সবখানেই চলছে বেচাকেনার ধুম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জার্সি সংস্কৃতিতে যুক্ত হয়েছে নতুন এক মাত্রা। শুধু প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম বা নম্বর নয়, অনেক ফুটবলপ্রেমী এখন নিজেদের নামও জার্সিতে লিখে নিচ্ছেন। বিশ্বকাপকে ঘিরে বন্ধুদের আড্ডা, খেলা দেখা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি শেয়ার করার জন্য নিজের নাম লেখা জার্সির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

ঢাকার বিভিন্ন স্টুডিও এবং ডিজিটাল প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানে সহজেই এ সেবা পাওয়া যায়। সাধারণত ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যেই জার্সির সামনে বা পেছনে নাম ও পছন্দের নম্বর প্রিন্ট করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল হিট-প্রেস মেশিনে কাজটি সম্পন্ন করতে সময় লাগে মাত্র কয়েক মিনিট। বিশ্বকাপের উন্মাদনায় তাই এখন শুধু দল বা খেলোয়াড় নয়, নিজের পরিচয়ও জায়গা করে নিচ্ছে জার্সির বুকে। ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের এ নতুন ধারা তরুণদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

এক সময় ফুটবল সমর্থনের প্রকাশ ছিল পতাকা টাঙানো বা দেওয়ালে ছবি আঁকা। এখন জার্সি হয়ে উঠেছে সমর্থনের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাধ্যম। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, অফিসগামী কর্মজীবী, রিকশাচালক, ব্যবসায়ী-সব শ্রেণি-পেশার মানুষকেই দেখা যায় প্রিয় দলের জার্সি পরে ঘুরে বেড়াতে।

অনেকের কাছে জার্সি শুধুই একটি পোশাক নয়; এটি আবেগ, পরিচয় এবং ভালোবাসার প্রতীক। প্রিয় খেলোয়াড়ের নাম ও নম্বর লেখা জার্সি গায়ে তারা নিজেদের সেই দলের অংশ মনে করেন। বিশ্বকাপ ঘিরে জার্সির বাজার শুধু ফুটবলপ্রেমীদের আনন্দই বাড়ায় না, তৈরি করে একটি মৌসুমি অর্থনীতিও। পাইকারি ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা, ফুটপাতের হকার, স্থানীয় দর্জি, প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠান-অনেকেই এ সময় বাড়তি আয়ের সুযোগ পান। বিক্রেতাদের ভাষ্য, বিশ্বকাপের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বিক্রি বাড়তে শুরু করে এবং খেলা যত এগোয়, ততই বাড়ে চাহিদা। বিশেষ করে জনপ্রিয় দলগুলো জয় পেলে পরদিন সেই দলের জার্সি বিক্রিও বেড়ে যায়।

বিশ্বকাপের এ সময়ে জার্সি তাই শুধু কাপড়ের তৈরি একটি পোশাক নয়; এটি আনন্দের, আবেগের এবং বিশ্ব ফুটবলের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের এক অদৃশ্য বন্ধনের প্রতীক। মাঠের হাজার মাইল দূরের খেলা যেন একটি জার্সির মাধ্যমেই পৌঁছে যায় এ দেশের মানুষের হৃদয়ে।

জার্সির পাশাপাশি বিশ্বকাপকে ঘিরে জমে ওঠে বিভিন্ন ফুটবলসামগ্রীর বাজারও। প্রিয় দলের পতাকা, মাথার ব্যান্ড, ক্যাপ, রিস্টব্যান্ড, স্টিকার, পোস্টার, বাঁশি, এমনকি গাড়ি ও মোটরসাইকেলে লাগানোর ছোট পতাকারও ব্যাপক চাহিদা দেখা যায়। অনেক ফুটবলপ্রেমী বাড়ির ছাদ, বারান্দা কিংবা দোকানের সামনে প্রিয় দলের পতাকা উড়িয়ে সমর্থন প্রকাশ করেন। ছোট-বড় নানা আকারের পতাকা ১০০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। আর বড় আকারের পতাকা অনেকেই স্থানীয় দর্জির দোকানে অর্ডার দিয়ে তৈরি করে নেন। বিশ্বকাপ যত ঘনিয়ে আসে, ততই বাড়তে থাকে এসব সামগ্রীর বিক্রি। ফলে জার্সির পাশাপাশি পতাকা ও অন্যান্য সমর্থকসামগ্রীর বাজারও হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত ও জমজমাট।

বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললেও বিশ্বকাপ এ দেশের মানুষের হৃদয়ের এক বড় উৎসব। আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের সমর্থকদের খুনসুটি, বন্ধুদের আড্ডা, পাড়ার বড় পর্দায় খেলা দেখা, পতাকা আর জার্সির রঙে রঙিন হয়ে ওঠা চারপাশ-সব মিলিয়ে ফুটবল যেন এক অনন্য মিলনমেলা তৈরি করে।

শেয়ার করুন