বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

নেত্রকোণায় অকাল বন্যার শঙ্কা: টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো ধান

মুহা. জহিরুল ইসলাম অসীম :
টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার নদ-নদী ও হাওরের পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে জেলার বিভিন্ন হাওর ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো ধানের ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, দেখা দিয়েছে অকাল বন্যার আশঙ্কা।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ। মঙ্গলবার সকাল ৯টা থেকে বুধবার সকাল ৯টা পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত হয়। ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কংস নদের জারিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যেখানে বিপৎসীমা ৭ দশমিক ১৭ মিটার।
এছাড়া ধনু নদের খালিয়াজুরী পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানির প্রবণতা ঊর্ধ্বমুখী। সকাল ৯টায় সেখানে পানির উচ্চতা ছিল ৩ দশমিক ৮৬ মিটার, যেখানে বিপৎসীমা ৪ দশমিক ১৫ মিটার।
এক সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে জেলার কংস, ধনু, উব্দাখালী, সোমেশ্বরী, মগড়া ও ভুগাই নদীর পানি ক্রমাগত বাড়ছে।
এতে খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দা উপজেলার হাওরাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে। এসব এলাকার একমাত্র ফসল বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আটপাড়া, বারহাট্টা ও পূর্বধলা উপজেলার উঁচু জমিতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, জেলায় এবার ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ মেট্রিক টন। তবে এখন পর্যন্ত হাওরের মাত্র ৫২ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে।
অতিরিক্ত পানির কারণে অনেক জমিতে হারভেস্টার যন্ত্র প্রবেশ করতে পারছে না। অন্যদিকে শ্রমিক সংকট এবং বজ্রপাতের আতঙ্কে কৃষকেরা মাঠে যেতে পারছেন না। গত এক মাসে বজ্রপাতে খালিয়াজুরী, আটপাড়া ও দুর্গাপুর উপজেলায় অন্তত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মঙ্গলবার একদিনেই খালিয়াজুরীতে তিনজন মারা যান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খালিয়াজুরীর ছায়ার, বায়রা, চুনাই, বাইদ্যার চরসহ বিভিন্ন হাওর এবং মোহনগঞ্জ, মদন ও কলমাকান্দার কয়েকটি হাওরে প্রায় দেড় হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ইতোমধ্যে পানিতে তলিয়ে গেছে। অধিকাংশ ফসলি জমিতে হাঁটুর ওপর পানি জমে রয়েছে।
খালিয়াজুরীর জগন্নাথপুর গ্রামের কৃষক আবদুস সালাম বলেন, “ধনু নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। হাওরের অর্ধেক জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। পানির কারণে সব ধান ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, কিন্তু শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।”
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন জানান, “ইতোমধ্যে প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এখনো উপজেলার অর্ধেক জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে।”
নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “ভারতের চেরাপুঞ্জি, সিলেট ও সুনামগঞ্জ এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় নদীর পানি আরও বাড়তে পারে। এতে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সব ফসল রক্ষা বাঁধ অক্ষত আছে। আমরা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান জানান, “কৃষকেরা যাতে দ্রুত ধান কাটতে পারেন, সে জন্য উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পিআইসি কমিটি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইউএনওরা মাঠে কাজ করছেন এবং সার্বক্ষণিক তদারকি চলছে।”
এদিকে ক্রমাগত পানি বৃদ্ধি ও ফসলহানির আশঙ্কায় হাওরাঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। পানি আরও বাড়লে তাদের সারা বছরের জীবিকা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শেয়ার করুন