লন্ডনে যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের মানবপাচার ও যৌন নিপীড়ন চক্রের ভয়াবহ চিত্র ফাঁস করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এপস্টেইন ফাইলস নামে পরিচিত লাখ লাখ ইমেইল, ব্যাংক রেকর্ড এবং রসিদ বিশ্লেষণ করে বিবিসির এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, লন্ডনের অভিজাত এলাকা কেনসিংটন এবং চেলসিতে এপস্টেইন চারটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন, যেখানে যৌন নিপীড়নের শিকার নারী ও তরুণীদের রাখা হতো।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এপস্টেইন অন্তত ছয়জন নারীকে এসব ফ্ল্যাটে রেখেছিলেন, যারা পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। এই নারীদের বড় অংশই রাশিয়া ও পূর্ব ইউরোপের নাগরিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০১৫ সালে ভার্জিনিয়া জুফ্রে নামক এক নারী এপস্টেইনের বিরুদ্ধে লন্ডনে মানব পাচারের অভিযোগ তোলার পরও ব্রিটিশ পুলিশ কোনো তদন্ত শুরু করেনি। পুলিশের এই নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে এপস্টেইন বছরের পর বছর তার এই অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন।
এপস্টেইন ফাইলস থেকে জানা যায়, ২০১৯ সালে গ্রেফতারের কয়েক মাস আগে পর্যন্ত তিনি লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা নারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তিনি নিজেকে তাদের ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন, যিনি ভাড়া নেওয়ার বদলে উল্টো টাকা দেন। নথিতে দেখা গেছে, তিনি এসব নারীর পড়াশোনার খরচ, ফার্নিচার কেনা এমনকি ইংরেজি শিক্ষার কোর্সের জন্যও অর্থ প্রদান করতেন। বিনিময়ে অনেককে তার যৌন পাচার চক্রে নতুন নারী সংগ্রহের কাজ করতে বাধ্য করা হতো।
এপস্টেইন কেবল ফ্ল্যাটই ভাড়া করেননি, বরং অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে আন্তঃদেশীয় পাচার কার্যক্রম চালিয়েছেন। ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে তিনি ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে অন্তত ৫৩ বার নারীদের ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে আনা-নেওয়া করেছেন। এর মধ্যে ৩৩টি টিকিট কেনা হয়েছিল ২০১৫ সালে পুলিশের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর। এমনকি গ্রেফতারের মাত্র ১৬ দিন আগেও তিনি একজন নারীকে লন্ডনে নিয়ে এসেছিলেন। এছাড়া শতাধিক ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক ফ্লাইট ব্যবহারের তথ্যও এই ফাইলে পাওয়া গেছে।
মানবাধিকার আইনজীবী টেসা গ্রেগরি এবং সাবেক ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা কেভিন হাইল্যান্ড পুলিশের এই ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো তদন্ত শুরু না করা একটি বড় ব্যর্থতা।
বিবিসির অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, ২০২০ সালে দ্বিতীয় আরেক নারী এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিলেও পুলিশ তা আমলে নেয়নি। মেট্রোপলিটন পুলিশ অবশ্য দাবি করেছে, তারা আন্তর্জাতিক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করেছে।
এই কেলেঙ্কারিতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য অ্যান্ড্রু মাউন্টব্যাটেন-উইন্ডসর এবং অভিজাত ব্রিটিশ নাগরিক ক্লেয়ার হ্যাজেল-এর নামও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদিও অ্যান্ড্রু শুরু থেকেই কোনো অন্যায়ে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে আসছেন।
এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তার সহযোগীদের অনেকেই এখনও লন্ডনে বসবাস করছেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুক্তভোগী নারী এবং মানবাধিকার কর্মীরা এখন এই পুরো ঘটনায় পুলিশের গাফিলতি খতিয়ে দেখতে একটি প্রকাশ্য গণতদন্তের দাবি জানাচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি।





