মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আঁচ পৃথিবীজুড়ে, কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে রয়েছে নানা শঙ্কা। তবুও চিরন্তন নিয়মে আজ উদিত হয়েছে নতুন সূর্য। এসেছে বৈশাখের প্রথম রাঙা সকাল-নতুন বছর ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ। ঘরে-বাইরে নান্দনিক বেশে আবহমান বাঙলার ঐতিহ্যকে ধারণ করে নতুনেরে বরণ করছে মানুষ। ঝড়-ঝঞ্ঝা ঝেড়ে ফেলে করবে সুন্দর আগামীর প্রত্যাশা। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়- ‘ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবৈশাখীর ঝড়/…ভেঙে আবার গড়তে জানে সে চির সুন্দর।’
তাইতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানট, উদীচী থেকে শুরু করে পুরো রাজধানী আজ রূপ নিচ্ছে বর্ণিল আবহে। অতীতের মতোই রমনা বটমূলে ভোরের আলো প্রক্ষেপণের সঙ্গে ‘ভয়শূন্য চিত্তে’ ছায়ানটের শিল্পীরা করবে বর্ষবন্ধনা- ‘এসো হে বৈশাখ, এসো হেসো’। ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ প্রতিপাদ্যে মঙ্গলবার সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে অনুষ্ঠান শুরু হবে। সমাবেত কণ্ঠে ‘জাগো আলোক-লগনে’ গানের মধ্য দিয়ে। এরপর ২ ঘণ্টার আয়োজনে রবীন্দ নাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, লালন সাঁই, দ্বিজেন্দ লাল রায়, অজয় ভট্টাচার্য, আবদুল লতিফ, জ্যোতিরিন্দ মৈত্র’র গান একক ও সমবেত শিল্পীর কণ্ঠে শোনা যাবে। রমনার নির্মল সবুজ-শ্যামল পরিবেশে আগতদের পাশাপাশি নানা মিডিয়ার কল্যাণে এই সুরের মূর্ছনা পৌঁছাবে গানপ্রিয় বাঙালির মনে ও মননে।
ছায়ানটের পরিবেশনা শেষ হতে না হতেই চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ প্রতিপাদ্যে সকাল ৯টায় ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’ বের করা হবে। এটি চারুকলা অনুষদের ৩ নম্বর গেট থেকে শুরু করে শাহবাগ থানার সামনে গিয়ে ইউ-টার্ন নেবে। সেখান থেকে রাজু ভাস্কর্য ও টিএসসি প্রাঙ্গণ ডান পাশে রেখে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমির সামনে দিয়ে পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শোভাযাত্রা শেষ হবে। শোভাযাত্রার মূল মোটিফের মধ্যে মোরগের পেছনে সূর্যের মোটিফ দিয়ে গ্রামীণ সকালের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধসহ নানা জটিলতার মধ্যে শান্তির বার্তা দেবে পায়রা, শহুরে সংস্কৃতিতে লোক ঐতিহ্যকে মনে করিয়ে দেবে সোনারগাঁয়ের কাঠের হাতি। লোকায়াত জীবনে বাউল শিল্পীদের ভূমিকা ও সাম্প্রতিক সময়ে বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদস্বরূপ থাকছে দোতারা। এসব শিল্পকর্মে তুলির আঁচড়ে দেওয়া হয়েছে পটচিত্র ও নকশিকাঁথার সমন্বয়। এসব শিল্পকর্মে আছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতাও। পটচিত্র আকবর অঙ্কনের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হবে বর্ষবরণে মুঘল সম্রাট আকবরের অবদানের কথা। কালের যাত্রার মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে পৌঁছার বিষয়টিও জানান দেবে শোভাযাত্রায় স্থান পাওয়া নানা মোটিফ।
শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা শুধু নীলক্ষেত ও পলাশী মোড় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন। শোভাযাত্রা চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রবেশপথ ও সংলগ্ন সড়ক বন্ধ থাকবে। শৃঙ্খলা ও সৌন্দর্য রক্ষার্থে আশপাশ দিয়ে শোভাযাত্রায় প্রবেশ করা যাবে না। শেষপ্রান্ত দিয়ে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণের জন্য সবার প্রতি অনুরোধ করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তার স্বার্থে শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের নিজ নিজ পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।
অন্যদিকে বর্ষবরণ পর্ষদ নামে একটি সংগঠন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’সহ দিনভর অনুষ্ঠান করার ঘোষণা দিয়েছে। ‘জাগাও পথিকে, ও সে ঘুমে অচেতন’ প্রতিপাদ্যে আজ ধানমন্ডি ২৭ এলাকায় সকাল ৯টায় আয়োজন শুরু করবে। ইতোমধ্যে চারুকলার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীসহ শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষেরা বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করে অনুষ্ঠান সফল করার জন্য সবাইকে আহ্বান করতে দেখা গেছে।
নববর্ষ উপলক্ষ্যে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রাষ্ট্রপতি তার বাণীতে বলেছেন, ‘বাংলা নববর্ষ আমাদের প্রাণের সর্বজনীন উৎসব। এটি আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ অতিক্রম করে পহেলা বৈশাখ আমাদের সবার জন্য হয়ে ওঠে এক আনন্দ ও মিলনের দিন।’
প্রধানমন্ত্রী তার বাণীতে বলেছেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতিসত্তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই দিনটি আমাদের জীবনে প্রতি বছর ফিরে আসে নতুনের আহ্বান নিয়ে। নতুন বছরের আগমনে পুরোনো জীর্ণতা ও গ্লানি পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়। তিনি নববর্ষের প্রথম দিন দেশবাসীসহ বিশ্বের সব বাংলাভাষী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বাংলা ১৪৩২ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ কে স্বাগত জানান। বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এক বিবৃতিতে বলেছেন, এবারের নববর্ষ আমাদের জীবনে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে এসেছে। তিনি দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি ভাইবোনদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
বর্ষবরণে বাংলা একাডেমি : বাংলা একাডেমিতে পোট্রেটের কবি নাসির আলী মামুনের ‘ফটোজিয়াম : স্মৃতি-বিস্মৃতির মুখচ্ছবি’ শীর্ষক ৬৭তম একক আলোকচিত্র প্রদর্শনী আজ সকাল ১০টায় উদ্বোধন হবে। এর আগে সকাল ৮টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে বর্ষবরণ সংগীত, সকাল সোয়া ৮টায় নববর্ষ বক্তৃতা এবং সকাল ৯টায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়াও থাকছে বইয়ের আড়ং এবং বাংলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) যৌথ উদ্যোগে একাডেমি প্রাঙ্গণে ১ বৈশাখ থেকে ৭ বৈশাখ পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী বৈশাখী মেলা।
শিল্পকলায় ৫ দিনের আয়োজন : বাংলা নববর্ষ ও চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে থাকছে ৫ দিনের সাংস্কৃতিক কর্মসূচি। রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে থাকছে সাংস্কৃতিক উৎসব, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান ও বৈশাখী মেলা। ৫ দিনের আয়োজনে থাকছে ঢাক-ঢোল, লাঠিখেলা, ঘুড়ি উড়ানো, লাটিম খেলা, জারিগান, সারিগান, পটগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রাপালা, কবিগান, গাজির গান, গম্ভীরা, ভাওয়াইয়া গান, পুতুলনাট্য, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও বৈশাখী মেলার মতো নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ আয়োজন। আজ বিকাল ৪টায় জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে শুরু হবে বর্ষবরণের আয়োজন। থাকবে কবিগান, গাজির গান, গম্ভীরা, বাউল গান ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর গান ও নৃত্য পরিবেশনা।
এছাড়া ঢাকা ও ঢাকার বাইরে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন, সরকারি প্রতিষ্ঠান সবখানে বর্ষবরণের আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে।





