মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দুর্ঘটনার পরপর প্রাথমিক চিকিৎসায় কী করবেন

দুর্ঘটনার পরপর প্রাথমিক চিকিৎসায় কী করবেন

বাংলাদেশে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হন। ঘরে রান্না করতে গিয়ে হাত কেটে যাওয়া, শিশু পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগা, রাস্তায় দুর্ঘটনা, আগুনে বা গরম পানিতে পুড়ে যাওয়া-এসব ঘটনা আমাদের চারপাশে অহরহ ঘটে। এমন হলে বেশির ভাগ সময় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি এবং কী করা উচিত তা বুঝে উঠতে পারি না। অনেক সময় অজান্তেই ভুল চিকিৎসা করে পরিস্থিতি আরও খারাপ করে ফেলি। দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগের প্রথম কয়েক মিনিটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় সঠিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারলে অনেক ক্ষেত্রে রক্তপাত বন্ধ করা যায়, সংক্রমণ কমানো যায় এবং কখনো কখনো প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়। বিস্তারিত লিখেছেন ডা. নাসিম তানভীর

* প্রাথমিক চিকিৎসা কী

প্রাথমিক চিকিৎসা হলো দুর্ঘটনার পর চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার আগ পর্যন্ত রোগীকে নিরাপদ রাখার প্রাথমিক ব্যবস্থা। এটি কোনো চূড়ান্ত চিকিৎসা নয়, কিন্তু রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং পরবর্তী চিকিৎসাকে সহজ করে তোলে।

 

* ধারালো জিনিসে কেটে গেলে

রান্না করতে গিয়ে ছুরিতে কেটে যাওয়া, ভাঙা গ্লাসে পা কেটে যাওয়া বা টিনে হাত লেগে কেটে যাওয়া খুবই সাধারণ দুর্ঘটনা। এমন অবস্থায় প্রথমেই পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে ক্ষতের ওপর চাপ দিতে হবে। হাত বা পা কেটে গেলে সে অংশ হৃৎপিণ্ডের চেয়ে একটু উঁচুতে রাখতে হবে। যদি হাত কেটে যায়, আহত ব্যক্তিকে বসিয়ে বা শুইয়ে দিন। এরপর কাটা হাতটি বুকের উচ্চতার চেয়ে একটু ওপরে তুলুন। কনুই ভাঁজ করে বুকের ওপর রেখে দেওয়া যায়, অথবা বালিশ, তোয়ালে বা ভাঁজ করা কাপড় দিয়ে হাতটিকে ঠেস দিয়ে উপরে তুলে রাখা যায়। কেউ পাশে থাকলে তিনি হাতটি ধরে উঁচু করে রাখতে পারেন। যদি পা কেটে যায়, আহত ব্যক্তিকে শুইয়ে দিন। এরপর পায়ের নিচে বালিশ, তোয়ালে, কাপড়ের বান্ডিল বা ব্যাগ দিয়ে ঠেস দিন, যেন পা বুকের উচ্চতার কাছাকাছি বা তার চেয়ে একটু উঁচুতে থাকে। হাঁটুর নিচে ও গোড়ালির নিচে ঠেস দিলে পা স্থির থাকে এবং রক্তপাত কমে। এ অবস্থায় ক্ষতের ওপর পরিষ্কার কাপড় বা গজ দিয়ে চাপ দিতে হবে। শুধু উঁচুতে রাখলেই হবে না, চাপ দেওয়া এবং উঁচুতে রাখা একসঙ্গে করলে রক্তপাত সবচেয়ে ভালোভাবে কমে।

রক্তপাত কমে এলে পরিষ্কার পানি দিয়ে ক্ষতের চারপাশ ধুয়ে নিতে হবে। এরপর স্যাভলন বা পভিডোন আয়োডিন ব্যবহার করা যায়। স্যাভলন ব্যবহার করলে এক চা চামচ স্যাভলন আধা লিটার পরিষ্কার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ক্ষতের চারপাশ পরিষ্কার করতে হবে। বিটাডিন হলে অল্প করে লাগানো যায়। দিনে এক থেকে দুবারের বেশি নয়। ক্ষতে হলুদ, ছাই, টুথপেস্ট, তেল বা মাটি দেওয়া উচিত নয়। গভীর ক্ষত বা রক্তপাত বন্ধ না হলে হাসপাতালে নিতে হবে।

 

* পড়ে গেলে বা ভোঁতা জিনিস দিয়ে আঘাত পেলে

বাথরুমে পা পিছলে পড়ে যাওয়া, খেলতে গিয়ে পড়ে যাওয়া বা সিঁড়িতে ধাক্কা লাগলে শরীরে ভোঁতা জিনিসে আঘাত লাগতে পারে। এ সময় আঘাতের জায়গায় ফোলা, ব্যথা এবং নীলচে দাগ দেখা যায়। এমন অবস্থায় আঘাতের জায়গায় ঠান্ডা সেঁক দিতে হবে। বরফ বা ঠান্ডা পানিতে ভেজানো কাপড় ১৫ থেকে ২০ মিনিট ধরে রাখতে হবে। দিনে কয়েকবার এটি করা যেতে পারে। আঘাত পাওয়া অংশকে বিশ্রামে রাখতে হবে। ব্যথা খুব বেশি হলে, হাত বা পা বাঁকা দেখালে অথবা নড়াতে না পারলে দেরি না করে হাসপাতালে যেতে হবে।

 

* মাথায় আঘাত

শিশু খেলা করতে গিয়ে পড়ে গেলে, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় বা বাথরুমে পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লাগতে পারে। মাথায় আঘাতের বিষয়টি কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বারবার বমি, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা বা খিঁচুনি হলে তা বিপজ্জনক লক্ষণ। এ অবস্থায় রোগীকে শুইয়ে দিতে হবে এবং মাথা ও ঘাড় নাড়ানো যাবে না। রোগী অজ্ঞান থাকলে মুখে পানি বা ওষুধ দেওয়া যাবে না। এসব লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

 

* আগুনে বা গরম পানিতে পুড়ে গেলে

চুলার আগুনে হাত পুড়ে যাওয়া, গরম তেল বা গরম পানি পড়ে যাওয়া সচরাচর ঘটে থাকে। এমন হলে সঙ্গে সঙ্গে পোড়া জায়গা ঠান্ডা পানির নিচে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ধরে রাখতে হবে। এতে জ্বালা কমে এবং পোড়ার গভীরতা কম হয়। এরপর পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। সম্ভব হলে সিল্ভার সালফাডায়াজিন ক্রিম (বাজারে বার্না নামে পাওয়া যায়) ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে ঠান্ডা পানিতে পোড়া স্থানটি ভেজানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

* অতিরিক্ত রক্তপাত

রাস্তার দুর্ঘটনায় বা ধারালো বস্তুর গভীর আঘাতে অনেক সময় অতিরিক্ত রক্তপাত হয়। যদি রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হয় তাহলে ভাবতে হবে এখানে কোনো ধমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যা কিনা ওই ব্যক্তির জীবন ঝুঁকির মাঝে ফেলতে পারে। এ অবস্থায় পরিষ্কার কাপড় দিয়ে ক্ষতের ওপর জোরে চাপ দিতে হবে। কাপড় রক্তে ভিজে গেলে তা খুলে না ফেলে তার ওপর আরেকটি কাপড় দিতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

* হাড় ভাঙা সন্দেহ হলে

দুর্ঘটনার পর কেউ উঠে দাঁড়াতে না পারলে বা হাত-পা অস্বাভাবিক দেখালে হাড় ভাঙার আশঙ্কা থাকে। এ সময় সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো নড়াচড়া বন্ধ রাখা। যে অবস্থায় আছে, সে অবস্থায় রাখতে হবে। জোর করে সোজা করার চেষ্টা করা যাবে না। কাঠ, শক্ত কার্ডবোর্ড বা বই দিয়ে হালকা করে স্থির করা যায়। ঠান্ডা সেঁক দিলে ব্যথা কিছুটা কমে। পিঠ বা ঘাড়ে আঘাতের সন্দেহ থাকলে একেবারেই নড়ানো যাবে না। দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।

 

* শেষ কথা

প্রাথমিক চিকিৎসার জ্ঞান আমাদের শুধু কিছু নিয়ম বা কৌশল শেখায় না-এটি আমাদের মানুষ হিসাবে দায়িত্ববান করে তোলে। হঠাৎ বিপদের মুহূর্তে যখন চারপাশে আতঙ্ক আর অসহায়ত্ব নেমে আসে, তখন সামান্য সচেতনতা, সাহস আর সময়মতো নেওয়া একটি সঠিক পদক্ষেপই হতে পারে কারও জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানের পার্থক্য। হয়তো সেই মুহূর্তে পাশে দাঁড়ানো মানুষটি ডাক্তার নন, কিন্তু তার জ্ঞান, মানবিকতা ও উদ্যোগই কারও জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে।

 

লেখক : ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন